Logo

সারাদেশ

নেত্রকোনা হাওরে বিপর্যয়

পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের বোরো ফসল

Icon

জাহিদ হাসান, নেত্রকোনা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১৫

পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের বোরো ফসল

পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি কারণে  এ বছর নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে নিয়ে এসেছে মৌসুমের আগেই বড় ধরনের দুর্যোগ। ধানের শীষ বের হয়ে সোনালি হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত হঠাৎ করেই ডুবে গেছে পানিতে। পানি চলাচলের সুযোগ্ না  থাকায়   জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে , যা কৃষকের স্বপ্নকে মুহূর্তেই অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। যে সময়ে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেয়ার কথা, ঠিক তখনই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢল অতিবৃষ্টিতে অন্তত ৫০৫ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এর আগে মার্চের মাঝামাঝি শিলাবৃষ্টিতে আরও ৩২৩ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েক গুন  বেশি। অনেক ক্ষেতেই কাঁচা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে ডুবে আছে, ফলে ফলন ঘরে তোলাই অনিশ্চিত হয় পড়েছে। তবে কৃষকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ডা. মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বাংলাদেশের খবর  বলেন, হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয় ১৫ এপ্রিলের পর। যদিও এসময়েই নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে শুরু হয় বৃষ্টি। কিন্তু এবার মার্চ মাসের শুরু থেকেই আগাম অতিবৃষ্টি হওয়ায় হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অতিবৃষ্টিতে হাওরের বোরো ফসল জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বলেন, পলি মাটি কমে যাওয়ায় হাওরের দোআঁশ মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা নেই। এতে কৃষকদের আতঙ্ক হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, হাওরের ধান গাছের চারা পুরোপুরি না ডুবলে বা ধান গাছের শীষের নিচ পর্যন্ত পানি থাকলে কোনো সমস্যা নেই। এতে ১৫ - ২০ দিন পর্যন্ত জলাবদ্ধ পানিতে থাকলেও ধান গাছের চারা পচে না। পরিবেশের বিরূপ আচরণের বিষয়ে ডা. আলমগীর হোসেন বলেন, হাওরে অপরিকল্পিত সাবমার্সেবল সড়ক নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের প্রবাহ আটকে থাকে। তা ছাড়া হাওরের সব সড়কে অধিক সেতু নির্মাণ ও হাওরের খালগুলো খনন করলে অতিবৃষ্টি হওয়ার পরেও জলাবদ্ধতা দেখা দিবে না বলে জানান।

জেলা কৃষি সমম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সম্প্রতি জেলার সদর, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, খালিয়াজুরী, বারহাট্টা, পূর্বধলা, মদন ও কেন্দুয়া উপজেলায় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতায় বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে ৫০৫ হেক্টর। এর আগে গত ১৫ মার্চ জেলা সদরসহ চার উপজেলায় ৩২৩ হেক্টর জমির বোরো ধান শিলায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত বা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশি। স্থায়ীয়রা বলছেন, হাওরে কত মিলিমিটার বৃষ্টি হলে পানি জমা থাকে বা কতদিন বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতায় ধানের চারা পানির নিচে থাকলে পচে না। এ বিষয়ে স্হানীয় কৃষি দপ্তর বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো তৎপরতা নেই। এই চার উপজেলার উৎপাদিত ধান শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং জেলার বাইরেও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এ বছর আবহাওয়ার বিরূপ আচরণে নির্ধারিত সময়ে জমিতে ধান রোপণ করা ফসল জলাবদ্ধতায় ডুবে গিয়ে অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। আবার কোনো কোনো আবাদ করা ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হিসেবে দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, হাওর এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল হয়। বোরো ধানই তাদের একমাত্র ভরসা। যে বছর বোরো চাষে বিলম্ব হয়, সে বছর যদি আগাম দুর্যোগ আসে, এতে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, যা এবার হাওরে আগাম অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হাওরের কৃষকদের ভাবিয়ে তুলছে। এক ফসলি জমির ধান জলাবদ্ধতা বা শিলায় নষ্ট হলে সারা বছর পরিবার নিয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হয়।মেটাতে হবে ঋনের দায়দেনা। সরেজমিন ডিঙ্গাপোতা হাওরে ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিঙ্গাপোতা হাওরের মোহনগঞ্জ উপজেলার গৌড়াকান্দা গ্রামের ২৫ কেয়ার জমিতে ধান চাষ করেন কৃষক মুখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার এমনিতেই ফলন ভালো হয়নি। এখন বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে যা হয়েছে, তাতে সব ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। একই কথা বলেন তেঁতুলিয়া পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, স্থানীয় মহাজন, এনজিও ও আড়তদারদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে ২০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করেছি। এখন ধান বিক্রি করতে পারব কিনা সে চিন্তায় আছি।

তেঁতুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম জহর বলেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণসহ হাওরের খাল ও নদী খনন প্রয়োজন।

কৃষি আবহাওয়াবিষয়ক জেলা অফিসার ইনচার্জ মো. মামুন জানান, গত ১ সপ্তাহে নেত্রকোনা জেলা সদরে ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলা পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাসেম বলেন, জেলায় ৫৮টি স্লুইসগেট সচল রয়েছে।

এ বিষয়ে নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, মাঠে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সহায়তায় তৎপর রয়েছেন। যেসব কৃষকের জমিতে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না; প্রয়োজনে সেসব জমিতে সেচযন্ত্র বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হবে। উল্লেখ্য,জেলার মোট ১০টি উপজেলায় এ বছর বোরো ধান আবাদ করা হয় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে। 

 তার মধ্যে মদন মোহনগঞ্জ খালিয়াজুরী  কলমাকান্দা বারহাট্রাসহ হাওরাঞ্চলে  ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়।   এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধি জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর  রহমান কাছে জানতে চাইলে   তিনি বলেন, হাওরের বিপর্যয় থেকে সহায়তায় বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিকে/মান্নান 


Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন