বৈশাখেও বাহারি ডিজাইনের শাড়ি টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লীতে
প্রিন্স খান, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩৭
মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রতিটি তাঁতপল্লীতে এখনও চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে মহিলারা বয়ন, রংকরণ, টানাকরণ, নলী ভাড়া, কাপড় ভাঁজ ও প্যাকেটিংসহ বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন সমানতালে। জেলা শহর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার ও অনলাইন ব্যবসায়ীরা আসছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির রাজধানী খ্যাত টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারে পাথরাইলসহ বিভিন্ন গ্রামে।
মুলত টাঙ্গাইলে তাঁতিশ্রমিক ও ব্যবসায়ী অপেক্ষায় থাকেন দুটি ঈদ দূর্গা পূজো আর পহেলা বৈশাখ। কিছুদিন আগে ঈদ শেষ হয়েছে। ঈদ আর পহেলা বৈশাখ পাশাপাশি হওয়ায় একসাথে টাঙ্গাইলে তাঁতপল্লীতে চলে আলাদা আলাদা ডিজাইনের শাড়ি তৈরি। গতবছর পহেলা বৈশাখ রোজার মধ্যে হওয়ায় আর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেমন কোন ব্যবসা ছিল না। তবে এবার ব্যবসায়ীরা বলেছেন ঈদের পরে এবার পহেলা বৈশাখে যা আশা করছিলেন তার চেয়ে বেশি সাড়া পাচ্ছেন।
এবার ঈদ ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে এই তাঁতপল্লীতে তৈরি করেছে মনোমুগ্ধকর টাঙ্গাইলের সুতি, ডিজিটালপ্রিন্ট,হ াইব্রিড, সিল্কজামদানি, গ্যাসসিল্ক,মাসলাইসসিল্ক, হাফসিল্ক, বালুচুরি, শফটসিল্ক, রেশম,তশর,কাতান, রশম, একতারি, দোতারি প্রভৃতি নানা ধরণের ঈদ ও পহেলা বৈশাখের জন্য আলাদা আলাদ ডিজাইনের টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ।
আর এই বৈশাখী শাড়ি গুলো ৬০০ টাকা হতে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে আসা পাইকার ও খুরচা ক্রেতাদের কাছে। এছাড়াও এই শাড়িগুলো বাজিতপুর ও করটিয়া হাটে সপ্তাহে দুইদিন টাঙ্গাইলে বিভিন্ন শোরুমে বিক্রি হচ্ছে।
শুক্রবার সরকারি বন্ধের দিনে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়,পাথরাইল বিভিন্ন শোরুম গুলো ক্রেতাদের ভিড়। ঢাকা থেকে আসা ক্রেতার সানজিদা বলেন নতুন বছরের শুরুতে আমার নতুন স্বপ্ন দেখি।পুরনো ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাই। এইদিন আমরা সবার মঙ্গল কামনা করি। পরিবার পরিজনদের সাথে সময় কাটায়। পহেলা বৈশাখের আনন্দটা ভাগাভাগি করে নিতে টাঙ্গাইলে শাড়ি কিনতে আসা। আমি প্রতি পহেলা বৈশাখেই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহি শাড়ি নিতে আসি।
আরেক ক্রেতা তাবিয়া তাবাসতুম তুবা বলেন পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি, বৈশাখী মেলা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলে ঐতিহ্যবাহী বাহারি ডিজাইনের লাল-সাদা শাড়ি পড়ে যাওয়া বাঙ্গালি রীতি। এজন্য শাড়ি কিনতে আসা।
টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার বেলতা, পোড়াবাড়ি, ধুলটিয়া, বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, তারটিয়া, ও দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডি, ধুলুটিয়া,নলুয়া, দেওজান, নলশোঁধা, বিষ্ণুপুর, মঙ্গলহোড়,বাসাইল উপজেলার বাথুলী সাদী ফুলকি,নাগরপুর উপজেলার কেদারপুর,বারাপোষা,কালিহাতী উপজেলার বল্লা-রামপুর গ্রামে সচল থাকলেও নানা কারণে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলসহ আশপাশে গ্রাম গুলোতেই ছিল ১৫-২০ হাজার তাঁত। বর্তমানে তাঁত রয়েছে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার।
টাঙ্গাইল তাঁতি পুনর্বাসন সংস্থা (টালস্) এর ২০০১ সালের তাঁত জরিপ অনুসারে মোট তাঁত সংখ্যা ছিল ৭৫ হাজার ৪৬০টি। তার মধ্যে পিটলুম ২৭ হাজার ৬৮২টি, সেমী অটো বা চিত্তরঞ্জন তাঁত ৪৭ হাজার ৩৫৩টি এবং পাওয়ারলুম ৪২৫টি। সে সময়ই পিট লুম তাঁত ২-৩% কমেছে, সেমী অটো বা চিত্তরঞ্জন তাঁত ২-৩% বেড়েছে, পাওয়ারলুম তাঁত বেড়েছে ৪-৫%।
সর্বশেষ বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে, জেলার দক্ষিণের পাঁচটি উপজেলায় মোট তাঁতির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৭৮ জন। মোট তাঁত ছিল ১৪ হাজার ৬৪৪ টি এর মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ১১ হাজার ৩২১ টি। তারমধ্যে পিটলুম তাঁতের সংখ্যা ৫ হাজার ৭৬২ টি,সেমি অটো ৮ হাজার ৪০২ টি আর পাওয়ার লুম ৪০৫ টি। বর্তমানে পিটলুম ও সেমি অটো তাঁতের সংখ্যা কমে গেলেও দিগুন হারে বেড়েছে পাওয়ারলুম শুধু সদর উপজেলার পোড়াবাড়ি ইউনিয়নের বেলতা এবং বাঘিল ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর এলাকায় প্রায় ৩ হাজার পাওয়ার লুম রয়েছে। আর উওরের কালিহাতী উপজেলার রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৮৪টি পরিবার এবং তাঁত সংখ্যা রয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৬৫০। এরমধ্যে করোনায় সবচেয়ে বেশি বন্ধ হয়েছে তাঁত।
একাধিক তাঁত শ্রমিক বলেন, প্রতি বছরের মত এবারও আমরা সব তাঁতীরা ঈদ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শাড়ির তৈরিতে ব্যস্ত। কিন্তু এতে আমাদের কোন লাভ হয় না,লাভ হয় মহাজন ও শো রুম মালিকদের । তারা কোটি কোটি টাকা লাভ করছে নিত্য নতুন বাহাড়ি শাড়িতে। আর আমাদের যা মজুরি আছে তাই রয়েছে, সব কিছুর দাম বাড়লে আমাদের মজুরি বাড়ে নাই। সরকার থেকে কম সুদে লোন ও প্রণোদনা দেয় বিভিন্ন সময়ে শুধু মহাজনদের। আমাদের কোন লোন বা প্রণোদনা দেয় না। আমরা তাঁত শ্রমিকরা চাই আমাদের মুজরি বাড়েনো ও সরকার থেকে সাহায্য,না হয় আমরা একেবাড়েই চলতে পারবো না।
টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং এর মালিক রঘুনাথ বসাক বলেন, ঈদ চলে গেছে ঈদেও এবার ভাল ব্যবসা হয়েছে। আর ২০১৯ সালের করোনার পর এ বছর পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইল শাড়ির ভাল ব্যবসা হয়েছে। গত বছর রোজার মধ্যে পহেলা বৈশাখ পরলে আমরা তেমন কোন ব্যবসা করতে পারি নাই। তবে এবার আশানুরুপ ব্যবসা হয়েছে। আশা করি আগামী বছর থেকে পহেলা বৈশাখে আরও ব্যবসা ভাল হবে।
মনি ট্রের্ডাস টাঙ্গাইল শাড়ির মালিক নিমাই বসাক বলেন, এবছর টা আমার যা ভাবছি তার চেয়ে পহেলা বৈশাখের উৎসবটা ভাল পাচ্ছি। সে হিসেবে আমরা শাড়ি যা তৈরি করেছিলাম তার চেয়ে বেশি শাড়া পাচ্ছি। চাহিদা বাড়ার কারণে টাঙ্গাইলে যারা যারা পহেলা বৈশাখে শাড়ি তৈরি করে ছিলেন মোটামুটি সব শাড়িই বিক্রি হয়েছে । এটা আমাদের শাড়ি ব্যবসার জন্যে ভাল একটা দিক। বৈশাখ উপলক্ষে মনি টেড্রাস ১০-২০ হাজার শাড়ি বিভিন্ন ডিজাইনের তৈরি করে থাকি প্রায় সব শাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে।

