কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বহমান খাল বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামের উত্তর পাড়ার ব্রিজ থেকে আলগী পর্যন্ত প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি এখন আর খাল বলে চেনার উপায় নেই। কোথাও এটি ভরাট হয়ে গেছে, আবার কোথাও পার্শ্ববর্তী জমির মালিকদের দখলে চলে গেছে। পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খালটি এখন মৃত। হারিয়ে ফেলেছে তার বাস্তব অস্তিত্ব।
জানা গেছে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চন্দনপুর ও শিবনগরের মাঝখান দিয়ে এই খালটি খনন করা হয়। তৎকালীন যুবউন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেম খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। খালটি খননে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন শিবনগর গ্রামের শিক্ষানুরাগী ও সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিত্ব স্কুল শিক্ষক মরহুম তৈয়ব আলী পণ্ডিত।
খালটির বিষয়ে তৈয়ব আলী পণ্ডিতের ছেলে সিনিয়র সংবাদিক গোলাম আক্তার ফারুক বলেন, ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে খালটি কাটা হয়। কর্মসূচির উদ্বোধনের দিনে শিবনগরের হাটখোলার চকে আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। চন্দনপুর গ্রামের উত্তর প্রান্তে মেঘনা নদীর তীর থেকে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খনন কাজের উদ্বোধন করেন যুবউন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী কাশেম।
তিনি আরো বলেন, একসময় এই খালে ভরপুর পানি থাকতো। কৃষকরা এই খালের মাধ্যমে সেচ সুবিধা পেতেন। বর্ষাকালে খালটি দিয়ে নৌযান চলাচল করতো। নদীর স্রোত ্রপবেশ করতো খালেয়। সেই সঙ্গে মেঘনার মাছ এই খালে প্রবেশ আশপাশের বিল ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়তো। চন্দনপুর ও শিবনগরের বাসিন্দারা খালে জাল, বড়শি দিয়ে মাছ ধরে পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটাতেন, কেউ কেউ এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ায় মৎস্যজীবী ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি খালটি পুনরায় খনন করার জোর দাবি জানান।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘনা নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা এই খালটি একসময় আশপাশের অন্তত ৩০টি গ্রামের কৃষির প্রধান ভরসা ছিল। বর্ষা মৌসুমে খালে পর্যাপ্ত পানি জমে থাকত এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে খালটি প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, সময়মতো ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ আবার আবাদি জমিতে ঘর তুলে বসতি গড়ে তুলছেন। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে খালটি খনন না করায় এর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে এবং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। এ সুযোগে খালের পার্শ্ববর্তী জমির মালিকেরা ধীরে ধীরে খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছেন। ফলে খালটি এখন কার্যত তার অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছে বলে তাদের অভিযোগ।
এমন পরিস্থিতিতে খাল পুনর্খননে সরকারিভাবে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করে, যেখানে খাল, নদী ও জলাশয় খননে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা এবং অনুমোদিত ড্রেজার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুর থেকে সারাদেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। নির্বাচনকালীন অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বর্তমান বিএনপি সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২০০ কিলোমিটারেরও বেশি খাল পুনঃখনন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মেঘনা উপজেলায় খাল খননের তালিকা নিয়েই রয়েছে স্পষ্ট অসঙ্গতি। ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর প্রস্তুতকৃত তালিকায় খালের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২৩টি, অথচ উপজেলা তথ্য বাতায়ন ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে ৩৩টি খালের। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মেঘনা উপজেলার খাল খননের যে তালিকা পাঠিয়েছে, সেটিও পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, চন্দনপুর থেকে আলগী পর্যন্ত যে খালটি জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় খনন করা হয়েছিল, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংকটে এবং কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই খালটির নামই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরেজমিনে যাচাই না করেই তালিকা প্রণয়ন করায় এমন একটি জরুরি খাল উপেক্ষিত থেকে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অন্যদিকে পানি সংকটের কারণে কৃষিতে যে ধস নেমেছে, তার প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, আর কৃষকরা ধীরে ধীরে বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ বিষয়ে মেঘনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে খতিয়ে দেখে পরে বিস্তারিত বক্তব্য দেয়া হবে।
বিকে/মান্নান

