ফুলবাড়ীতে ধান-চালের বাজারে ধস, সংকটে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৯
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ধান ও চালের বাজারে হঠাৎ দরপতনে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বাজারে ধানের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় কৃষকেরা উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। একইসঙ্গে চালের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে প্রতিমণ ধানের দাম ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে চালের বাজারে প্রতিকেজিতে ২ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত দর কমেছে।
উপজেলার ফুলবাড়ী পৌরহাট, আটপুকুরহাট, মাদিলা
চিন্তামনহাট, বারাইহাট ও মেলাবাড়ী ধানের হাট ঘুরে দেখা যায়, ব্রি-২৮ ধান ২৫ ওজনের প্রতি
বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫০ থেকে ১৪০০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল প্রায় ১৬০০ টাকা। জিরাশাইল
ধান ১৯০০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ১৬০০ টাকায়, মিনিকেট ১৯০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। ব্রি-৭৫
ধান ১৩৫০ টাকা থেকে কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ১১৫০ টাকায়। একইভাবে স্বর্ণা-৫ ধান ১২০০ টাকা
থেকে কমে ১১০০ টাকায় ও গুটি স্বর্ণা ১১০০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০৫০ টাকায়।
ফুলবাড়ী আড়তদার লিটন প্রসাদ ও হারান দত্ত
ও মাদিলাহাটের আড়তদার এজাজুল ইসলাম জানান, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা
ধান ক্রয় করতে কম আসছেন। এছাড়া নতুন ধান বাজারে আসার সম্ভাবনায় সরবরাহ বেড়ে গেছে, যা
দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
আটপুকুরহাটে ধান নিয়ে আসা কৃষক আব্দুল
হামিদ বলেন, “ঈদের পর দাম বাড়বে ভেবে ধান ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু
এখন উল্টো দাম আরও কমে গেছে। এক মণ স্বর্ণা ধান ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫০০ টাকা,
অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১১০০ টাকায়। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।”
আটপুকুরহাটের ধান বাজারের আড়তদার মহব্বত
আলী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে পরিবহন
ব্যাহত হচ্ছে। এতে বাইরের জেলার ক্রেতা কমে গিয়ে বাজারে ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে। একারণে
ধানের দাম কিছুটা কমে গেছে।
অন্যদিকে চাল ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সংকটে
রয়েছেন। বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় তারা ধান বেশি দামে কিনতে পারছেন না। ফুলবাড়ী
উপজেলার বিভিন্ন চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশ থেকে চাল আমদানি বেশি
থাকায় দেশি চালের চাহিদা কমেছে।
উপজেলার আমিন অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী
সাইফুল ইসলাম বলেন, “গত বছর এই সময়ে ৭৫ কেজির এক বস্তা চিকন
মিনিকেট চাল ৩৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি হচ্ছে ২৯০০ টাকায়। এতে ব্যবসা টিকিয়ে
রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
আরেক ব্যবসায়ী মঞ্জিল মোরশেদ জানান, “চালের দাম কম
থাকায় ধানও কম দামে কিনতে হচ্ছে। এতে প্রতি লটে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত
থাকলে অনেকে আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বেন ব্যাংক ঋণদেনায় পরিশোধ নিয়ে সর্বশান্ত হয়ে
যাবেন।”
উপজেলার চালের মোকামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা
গেছে, পাইকারি পর্যায়ে এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে
কমেছে। বর্তমানে স্বর্ণা-৫ চাল প্রতি কেজি ৪৪ টাকা, জিরাশাইল ৬৪ টাকা, কাটারীভোগ ৭৪-৭৬
টাকা, মিনিকেট ৭২ টাকা এবং আঠাশ ৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মাস আগেও এসব চালের
দাম ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চাহিদার তুলনায়
আমদানি বেশি হওয়াই বাজারে এই দরপতনের অন্যতম কারণ।
রাজশাহী জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি
সামসুল হক মন্ডল বলেন, “ধান ও চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে
মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। কৃষক ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় ন্যুনতম লাভ নিশ্চিত
করা জরুরি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।”
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর
পদক্ষেপ না নিলে কৃষক ও চালকল শিল্প উভয়ই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

