Logo

সারাদেশ

কালাইয়ে আশ্রয়নের ঘরগুলো এখন মাদকসেবীসহ অপরাধীদের আখড়া

Icon

জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ২১:০৮

কালাইয়ে আশ্রয়নের ঘরগুলো এখন  মাদকসেবীসহ অপরাধীদের আখড়া

জয়পুরহাটের কালাইয়ের আশ্রয়ণের ফাঁকা ঘরগুলোই এখন মাদকসেবী- বিক্রেতা ও জুয়ারুদের আখড়ায় পরিনত হয়েছে। এ ছাড়াও এই ঘরগুলো এখন চোর-ছিনতাইকারী সহ নানা ধরনের অপরাধীদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে।

জানা গেছে, কালাই উপজেলায় সরকারের গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বাস্তবায়িত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফাঁকা ও পরিত্যক্ত ঘরগুলোর দিকে তুলনামুলক ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি কম থাকায় ওই ঘরগুলো নানা অব্যবস্থাপনা ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ওই ঘরগুলো নির্মানের পর কাগজে-কলমে প্রকৃত অসহায়দের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে সময়ের ব্যবধানে প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরই ভাড়াটে, জবর দখলকারী ও মাদক কারবারিদের দখলে চলে গেছে। ফলে সরকারের ভাল উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।  স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জনপ্রতিনিধি, তাদের আত্নীয়-স্বজন, এমনকি স্বচ্ছল ও প্রবাসী পরিবারও ঘর বরাদ্দ পেয়েছে। ১৫৯টি ভুমিহীন পরিবারের বসবাসের কথা থাকলেও গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামীলীগ-সমর্থিত অনেক উপকার ভোগী এলাকা ছাড়লে তখন তাদের ঘরগুলো প্রতিপক্ষরা দখল করে নেয়। বর্তমানে অনেক ঘর ভাড়া দেওয়া, তালাবদ্ধ রাখা কিংবা টাকার বিনিময়ে মাদক কারবারিদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে মাদক ও নানা রকম অসামাজিক কর্মকান্ডের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ২০২২- ২৩ অর্থবছরে দুটি প্রকল্পে মোট ১৫৯টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১৯টি সেমিপাকা ও ৪০টি টিনশেড। মাত্রাই ইউনিয়নের কাঁটাহার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৮টি ঘর বর্তমানে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ¯’ানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রকল্পটি এখন মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত, যেখানে বহিরাগতদের দখলে থাকা ঘরগুলোতে মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে। এই প্রকল্পের বরাদ্দ প্রাপ্ত ঘরের উপকারভোগী রোকেয়া বেগম, রজ্জব আলী ও ছাইদুর রহমান অভিযোগ করেন, মাদকসেবি ও তাদের সহযোগীরা প্রকল্পের বেশকিছু ঘর জবরদখল করে রেখেছে। এছাড়া প্রকল্পের ৫৫ নম্বর ঘরের উপকারভোগী নুরনবী-কুলসুম দ¤পতিকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে উ”েছদ করার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের বিনইল ও উত্তরপাড়ায় আশ্রয়নের ঘরগুলোতেও বহিরাগতদের আড্ডা, মাদকসেবন ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়রা জানান, বিনইলে দুটি ঘর ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। উপজেলার শ্রীপুর আশ্রয়ণে স্ব”ছল প্রবাসী পরিবারের বসবাস এবং অনেক ঘর তালাবদ্ধ থাকার চিত্রও পাওয়া গেছে। এছাড়া জিন্দারপুর,ঘাটুরিয়া ও বাদাউচ্চ আশ্রয়ণে থাকা ৬৩টি ঘরের অধিকাংশ ভাড়া বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাইকপাড়া ও লকইর আশ্রয়ণের প্রায় ২২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০টি ঘরের উপকারভোগীরা জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা শহরে বসবাস করছেন, আর বাকিগুলো প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একই চিত্র উপজেলার তালোড়া বাইগুনী পীরপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। এখানে ১৫৯টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৮০টি ভাড়াটিয়াদের দখলে। কর্মসংস্থানের অভাবে উপকারভোগীরা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে ঘরগুলো খালি পড়ে থাকায় মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। আর প্রকৃত মালিকরা দীর্ঘদিন অনুপ¯ি’ত। এছাড়া ঘুষের মাধ্যমে ঘর বরাদ্দের অভিযোগও রয়েছে। এ পকল্পের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, অনেক  স্থানে যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় ক্ষেতের সরু আইল দিয়ে চলাচল করতে হয়। এছাড়া এখানকার বর্ষায় পানি জমে, দেয়াল ফেটে যায় এবং রাতে মাদক কারবারিদের উৎপাত থাকে। অপর বাসিন্দা জিল্লুর বলেন, অনেক ঘরের দেয়ালে ফাটল, ছাউনি চুঁইয়ে পানি পড়া, খাবার সুপেয় পানির সংকট ও নিরাপত্তাহীনতার অভাবে বসবাসের পরিবেশ না থাকায় মানুষ এসব ঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অপর বাসিন্দা আজিজার রহমান বলেন, কখনো কখনো কাজ না থাকায় আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়। আশরাফ আলী বলেন, এখানে থাকলে জীবিকা নেই, আবার না থাকলে ঘরও নেই, সব মিলিয়ে আশ্রয়নের বাসিন্দারা চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে রয়েছে। এখানে পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশ কিছু নলকূপ চুরি হয়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের দুর দুরান্ত থেকে খাবার পানি আনতে হচ্ছে।

কালাই থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাদক কিংবা কোন অপরাধ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। সবেমাত্র এই বিষয়ে আমরা অবগত হলাম। আমরা দ্রুত খোঁজ খবর নিয়ে সত্যতা পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে জবরদখল, ভাড়া ও বিক্রির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থ নেওয়া হবে। যারা নিয়ম ভঙ্গ করেছেন তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত গৃহহীনদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং মাদক সহ যে কোনো অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিকে/মান্নান






Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন