নীলফামারীতে তাঁতশিল্প নানা সংকটে বিপাকে ১০ হাজার পরিবার
নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ২০:২২
নীলফামারীর সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও ভারতীয় কাপড়ের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এখন বিলপ্তির পথে তাঁতশিল্প। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার নারী ও পুরুষ। বাবা দাদার এই পেশা ধরে রাখতে লড়াই করছেন হাতেগোনা কয়েকজন তাঁতী।
১৯৪৭ সাল থেকে সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট, কাজীহাট, হাতিখানাসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজারের বেশি পরিবার তাঁতশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখানকার গামছা, তোয়ালে, শাড়ি ও বেনারসি দেশ ও বিদেশে রপ্তানী হতো এবং ব্যাপক চাহিদাও ছিলো।
পার্শ্ববর্তী দিনাজপুর চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর, সাতনালা, ভূষিরবন্দর, গছাহার, আলোকিডহি, বিন্যাকুড়ি এবং খানসামার গোয়ালডিহি, চন্ডীপাড়া ও কাচিনীয়াসহ শতাধিক গ্রামের ৫-৬ হাজার পরিবার এই শিল্প দিয়ে জিবিকা নির্বাহ করতো। এসব এলাকার উৎপাদিত পণ্য দেশ জুড়ে ব্যাপক চাহিদা ছিল। এই কারণেই সৈয়দপুরে তাঁতশিল্প বিস্তার লাভ করেছিল। এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। যারা এখনো এই পেশা ধরে রেখেছে, তারাও উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেনা। ফলে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
উপজেলার কাজীহাট এলাকার তাঁতি মোহাম্মদ হারুন জানান, ১৯৮৮ সাল থেকে এ পেশায় আছি। আগে এখানে প্রতিটি বাড়িতে তাঁত (হ্যান্ডলুম) ছিল, এখন একটিও নেই। বর্তমানে আমার ১০টি অটোলুমে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন। শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও বেনারসি তৈরি হলেও এখন রুমাল ও তোয়ালে তৈরী হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সরবরাহ এবং ভারতীয় কাপড় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
হারুণ ছাড়াও একই কথা তাঁতি মোহাম্মদ বদরুল বলেন,‘সুতার দাম বেড়েছে, চাহিদা কমেছে এবং উন্নত ফিনিশিং সুবিধার অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। সরকারি উদ্যোগে ক্যালেন্ডার মেশিন স্থাপন এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে শিল্পটি ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
রাণী বন্দর এলাকার বেনারসি প্রস্ততকারী মঈন জানান, ছয় বছর আগেই তার তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় এই এলাকার তৈরী বেনারসির ব্যাপক সুনাম ছিল। এ শিল্পের সঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি পরিবার জড়িত ছিল। এখন অনেকেই পেশার পরিবর্তন করছে। বর্তমানে ভারতীয় শাড়ি ও লেহেঙ্গা বাজার দখল করায় বেনারসির চাহিদা কমে গেছে।
শাড়ীর কারিগর আনারুল ইসলাম জানান, ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় আছি। দিন শেষে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। তিনি জানান, আধুনিকতার ছোঁয়ায় টিস্যুর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় রুমাল ও তোয়ালের চাহিদাও বাজারে কমে গেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সৈয়দপুর শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘সুতার মূল্যবৃদ্ধি এবং যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ব্যাপক সংকটে পড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার। তবে বিসিক থেকে শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে উন্নত প্রশিক্ষণসহ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।’
বিকে/মান্নান

