শতবর্ষের পথচলায় শতবর্ষী বটবৃক্ষ ও কালিদাস হাট
সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ২০:০৭
কালিদাস হাটের যুগ যুগান্তরের সৌন্দর্যের শোভাবর্ধক হিসেবে শতবর্ষী বটবৃক্ষের গুরুত্ব রয়েছে। পূর্বপুরুষ প্রিয়জনদের প্রিয় প্রাঙ্গণ কালিদাস বাজার ও শতবর্ষী বটবৃক্ষ। শতবর্ষী বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়াতলে অগণিত মানুষ প্রাণ জুড়িয়েছে ও পরম প্রশান্তি পেয়েছে।
কল্যাণকর কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবদ্দশায় নিগুড় সফলতা খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষ মানুষের জন্য কথাটি চিরন্তন সত্য। প্রকৃতি, পরিবেশ, বৃক্ষ,তরুলতার কাছ থেকেও আমরা প্রতিটি মুহূর্তে ক্ষণে ক্ষণে উপকৃত হচ্ছি। বটবৃক্ষ মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ছায়া দেয় শান্তি দেয়। যদি কখনো বৈরী আবহাওয়া দুর্যোগের কারণে অথবা বয়সের ভারে নুহ্য হয়ে বট বৃক্ষের ডালপালা ভেঙে পড়ে তারপরেও মানুষকে বটবৃক্ষ নিঃস্বার্থভাবে মানুষ কে ছায়া দেয় শান্তি দেয়। একজন বাবা মা তাঁর সন্তানকে যেমন আগলে রাখেন, সুরক্ষা দেন ও নিরাপত্তা প্রদান করেন ঠিক সেই রকম ভাবেই বটবৃক্ষ মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর
ছায়া দেয়, শান্তি দেয় পরম প্রশান্তি দেয়।
বলছি একটি শতবর্ষী বটবৃক্ষের কথা। শতবর্ষের পথ পাড়ি দিয়ে, পুরানো দিনগুলোকে অতিক্রম করে একটি শতবর্ষী বটবৃক্ষ অতন্দ্র প্রহরীর মতো কালিদাস হাটে আসা অগণিত মানুষকে সুশীতল ছায়া দিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। কালিদাস বাজারের শতবর্ষী বটেবৃক্ষে বসবাসরত পাখির কুহুতানে মুখরিত হয় বট বৃক্ষের চারিপাশ। পাখির কলরবে সুমধুর গুঞ্জনে মুখরিত হয় চারিদিক। ফল ফুল বৃক্ষ তরুলতা পাতা গুল্ম, বনজ ফলজ ও ঔষধী গাছ আমাদের অক্সিজেন, ছায়া, ফুল ও ফল দিয়ে জীবনকে উপকৃত করছে প্রতিনিয়ত প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। কালিদাস গ্রামেই কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীদের কাছে এই শতবর্ষী বটবৃক্ষ অনেক প্রিয়। পূর্বপুরুষদের পদচারণায় মুখরিত ও বর্তমান সময়ে কালিদাস হাটে আগত সকল মানুষের সুপরিচিত ও প্রাণ জুড়ানোর মহীরুহস্বরূপ এই শতবর্ষী বটবৃক্ষ।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কালিদাস হাটে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ শতবর্ষী বটবৃক্ষ। শতবর্ষী বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় প্রাণ জুড়িয়েছে অগনিত মানুষ। শতবর্ষী বটবৃক্ষ কে কেন্দ্র করে সপ্তাহে দুইদিন (রবিবার ও বুধবার) বট বৃক্ষের ছায়াতলে গ্রাম্য হাট বসে। হাটে কালিদাস গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার লোকজন বাজার করতে আসে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত কালিদাস হাটে আসা দোকানদাররা তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে রাখে। হাঁটে আগত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবজি বিক্রেতা, কলা বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতা, মসলা বিক্রেতা, চারাগাছ বিক্রেতা, চা বিক্রেতা, মাটির হাড়িপাতিল, বাঁশের তৈরি চালুন, কোলা, টেপারী, টুকরী, ঝাড়ু, খালই বিক্রেতা ও পানসুপারি বিক্রেতা সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছে। হাটে গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দোকানপাট পরিচালনা করে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে অর্জিত উপার্জনের মধ্য দিয়েই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে রোজি রোজগারের সফলতা খুঁজে পায়।
স্থানীয় বাসিন্দা নিরাঞ্জন বিশ্বাস বললেন, আমার বাবা এবং দাদার কাছ থেকে এই বটগাছ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি। বটবৃক্ষের উপকারী দিকগুলো সম্পর্কে প্রশংসা শুনেছি। আমি ছোটবেলায় আমার বাবার সঙ্গে বটগাছের নিচে কালিদাস হাটে আসতাম। কালিদাস হাটের বট গাছের কাছাকাছি আসলেই আমার ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে হাটে আসার স্মৃতি মনে পড়ে যায়।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি শতবর্ষের এই বটগাছটি আরোও হাজার বছর আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুক। গ্রামের মানুষকে শীতল ছায়া দিয়ে যাক যে শীতল ছায়ায় আমরা আমাদের মন প্রাণ জুড়িয়েছি।
কালিদাস হাটের সবজি বিক্রেতা ওয়াজেদ খান বললেন, কালিদাস হাটে সপ্তাহে দুইদিন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন হাঁটে সবজি বিক্রি করে আয় রোজগার করে আমার সংসার চালাচ্ছি। অন্যান্য হাটের চেয়ে কালিদাস হাটে আমি সবজি বিক্রি করে মানসিক শান্তি পাই। কারণ হলো কালিদাস হাটের বিশাল বটবৃক্ষের ঠান্ডা ছায়াতে গরমের মধ্যেও সারাদিন আমি সবজি বেঁচাকিনি করতে পারি। ছোটবেলা থেকেই আমি এই বিশাল বটগাছটি অবিকল এরকমই দেখেছি।
সখীপুর সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নাসিমা আক্তার বললেন, বটবৃক্ষ আমাদের পরিবেশ প্রকৃতি ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বটবৃক্ষ শুধু মানুষকে শীতল ছায়া দিয়েই উপকৃত করছে না বরং বটবৃক্ষ কে কেন্দ্র করে যে সকল পাখিরা বটবৃক্ষে বাসা বেঁধেছে তাদের বাসস্থানের ঠিকানা হয়েছে এবং বটবৃক্ষের ফলবীজ পাখিদের আহার হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।
সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম শওকত আলী মাস্টার বললেন, গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফুল দেয়, ফল দেয়। কালিদাস হাটে অবস্থিত শতবর্ষী বটগাছটি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ শুধু মানুষকে ছায়া দিয়েই যাচ্ছে এ কথাটি যেমন চিরন্তন তেমনি বিশেষ করে বিভিন্ন পাখির খাদ্য আহার যোগাতে এবং পাখিদের বাসস্থানের জন্যও ভূমিকা রাখছে। বটগাছে যে ফলবীজ ধরে এই ফলবীজগুলো পাখিরা খেয়ে তাদের ক্ষুধা নিবারণ করে। আমি ছোটবেলা থেকেই কালিদাস বাজারের এই শতবর্ষী বটগাছটি দেখতে পাচ্ছি। মাঝে মাঝে হাটের দিন বট বৃক্ষের ছায়াতলে গিয়ে আমার প্রাণ জুড়াই।
বিকে/মান্নান

