নওগাঁয় সাত মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল অন্তত ৩০ জনের
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ২১:০৫
নওগাঁর সড়কগুলো যেন থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সংঘটিত পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। জুলাই মাসেও এই প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারী।
বছরের শুরুতে ৩১ জানুয়ারি ভোরে মহাদেবপুর উপজেলার পাঠকাঠি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ডাম্প ট্রাক যাত্রীবাহী অটোভ্যানকে চাপা দিলে পাঁচজন নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন নূরপুর এলাকার বিপুল পাহান (২৫) ও সঞ্জু রাও (৪৫)। এরপর ১১ মার্চ নওগাঁ-সান্তাহার বাইপাস সড়কের খলিশাকুড়ি এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ হারান এক দম্পতি। ২৫ মার্চ নিয়ামতপুর উপজেলায় ভ্যান, ভুটভুটি ও স্টিয়ারিং গাড়ির ত্রিমুখী সংঘর্ষে এক নারী নিহত হন।
১০ মে রাতে পত্নীতলার আমিনাবাদ ডাবল ব্রিজ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেটকার ব্রিজের রেলিংয়ে ধাক্কা লাগলে মান্দা উপজেলার মতিউর রহমান (৪৫) ও নাজমুল ইসলাম (৪৫) নিহত হন। ১৯ মে বদলগাছীতে সড়ক দুর্ঘটনায় এক সহকারী শিক্ষিকার মৃত্যুর খবর শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাসনিম আরা (১৪) নামে একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীও পরে মারা যায়।
২৪-২৫ মে রাতে মহাদেবপুর ও পত্নীতলা উপজেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। রাত ৮টার দিকে মহাদেবপুরের নওগাঁ-রাজশাহী আঞ্চলিক মহাসড়কের পিড়ার মোড় এলাকায় মোটরসাইকেল ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বদলগাছীর গাবনা গ্রামের আলী জাকের নিহত হন। একই রাতে পত্নীতলার নজিপুর-ধামইরহাট সড়কের গাহন মোড় এলাকায় ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় অটোভ্যানচালক আবু হাসান (৪৬) ও মাইক্রোবাসচালক তরিকুল ইসলাম (৪৫) নিহত হন।
১ জুন রাতে ধামইরহাট উপজেলার জয়পুরহাট-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের বিহারীনগর এলাকায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে আজিজার রহমান (২৩) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় তার বাবা নুরুজ্জামান (৪৫) গুরুতর আহত হন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে একই সময়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায়, যেখানে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাসিন্দা। ঈদ সামনে রেখে প্রিয়জনদের কাছে ফেরার পথে এই দুর্ঘটনায় উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে।
জুলাই মাসে মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের মসিদপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মো. ইয়াবিন (৬৫) নামে এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়।
নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের তৎপরতা কিছুদিন থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা শিথিল হয়ে যায়, ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোঃ তারিকুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জেলা পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে এবং বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিআরটিএ নওগাঁর সহকারী পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান জানান, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মাহমুদ সাইফুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।
সচেতন ব্যক্তিদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত তদারকি, দক্ষ চালক নিশ্চিত করা ও ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ছাড়া এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়।
বিকে/মান্নান

