Logo

সারাদেশ

গাজীপুর গণপূর্তে হেজবুল কবিরকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

Icon

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩৬

গাজীপুর গণপূর্তে হেজবুল কবিরকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হেজবুল কবিরকে ঘিরে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরে সরকারি গাড়ি ও বাসভবন ব্যবহার, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, ঠিকাদারদের কাজ বণ্টন, প্রকল্পের অর্থ ব্যয় এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। 

স্থানীয় ঠিকাদার ও দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এসব ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত চালকের পরিবর্তে নিজস্ব চালক দিয়ে সরকারি গাড়ি ব্যবহার, গাজীপুরে নির্ধারিত সরকারি বাসভবন ব্যবহার না করে ঢাকায় অবস্থান, ওই বাসভবনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো, স্থানীয় ঠিকাদারদের পাশ কাটিয়ে বাইরের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া এবং এপিপিভুক্ত প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার কাজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ।

২৫ মার্চ ২০২৫ সালে গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন হেজবুল কবির। গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের অফিস সহকারী কম্পিউটার কাম মুদ্রাক্ষরিক আনিসুজ্জামান আনিস ও মো. আবু সাঈদ  অভিযোগ করে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কর্মস্থলে তার উপস্থিতি অনিয়মিত। সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অনেক সময় তিন দিনও দপ্তরে পাওয়া যায় না তাকে। অফিসে এলেও কোনো কোনো দিন দুপুরের দিকে উপস্থিত হন। তার নির্ধারিত সরকারি চালককে বাদ দিয়ে নিজস্ব চালক দিয়ে প্রায় দেড় বছর ধরে সরকারি গাড়ি ব্যবহার এবং গাড়িটি গাজীপুরের বাইরেও ব্যবহারের অভিযোগ করেন তারা।

এছাড়াও সার্কিট হাউজসংলগ্ন নির্বাহী প্রকৌশলীর জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসভবন থাকা সত্ত্বেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। একই সঙ্গে ওই বাসভবনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলেও দাবি তাদের। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে হাজিরা রেজিস্টার, সরকারি গাড়ির লগবুক, জ্বালানি হিসাব, মুভমেন্ট রেজিস্টার, বাসভবনের প্রাক্কলন, কার্যাদেশ ও বিল-ভাউচার পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, হেজবুল কবিরের রূঢ় আচরণ এবং অধীনস্থদের মা-বাবা তুলে গালিগালাজের কারণে কর্মপরিবেশ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা আন্দোলনের চেষ্টা করলে চাকরির ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের জিপ চালক আবুল বাশার বলেন, আমাকে প্রায় দেড় বছর ধরে নির্বাহী প্রকৌশলীর গাড়ি চালাতে দেননি। নির্বাহী প্রকৌশলীর ইচ্ছার বাইরে গেলেই অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতেন। তিনি আরও বলেন,  ১৯৮৬ সালে গণপূর্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর তার চাকরি জীবনে এমন কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হয়নি। 

গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের ওয়ার্ক এসিস্টেন্ট আলমগীর হোসেন জানান, কর্মচারীদের মা-বাবা তুলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা এবং নির্দেশের বাইরে গেলে চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি দিতেন নির্বাহী প্রকৌশলী।

অফিস সহকারী আনিসুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, ভোলার গণপূর্ত বিভাগের অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেনসহ আরও তিন-চারজনকে নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের মাধ্যমে  টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং  দরপত্রের কার্যক্রম ঢাকায় বসে পরিচালনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার ফাইল ও নথি গাজীপুরের অফিসে না রেখে বাসায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন ওই কর্মকর্তা। স্থানীয় ঠিকাদাররা কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ দেওয়া হয়েছে-এমন বক্তব্য দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

তিনি বলেন, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের সরকারি প্রকৌশলী কামরুল আলম খানকে ওই নির্বাহী প্রকৌশলী তার স্বার্থে ওএসডি করে রেখেছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী বেসরকারি বিল্ডিংয়ের বেশ কিছু নকশা নিজে বিভিন্ন পার্টিদের সঙ্গে ডিল করতেন এবং তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে নকশার অনুমোদন দিতেন। 

তিনি আরও বলেন, তিন নম্বর সাব ডিভিশনের উপ-সহকারী ইঞ্জিনিয়ার মো. জাকির হোসেনকে তার ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার কারণে বেশ কয়েকবার অপদস্থ করেছেন। বদলি করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। 

আনিস বলেন, আমাকে জীবনের শেষ করে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছেন ওই নির্বাহী প্রকৌশলী হেজবুল কবির। যে কোনো ফাইলে হাত দিতে মানা করেছেন। তার কথামতো কাজ না করলে দূরে বদলি করে দেবেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা তথ্য চাইলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে হুমকি দেওয়াতেন।

গাজীপুর পিডব্লিউডির অফিস সহায়ক আনোয়ার হোসেন, ক্লিনার সুলাইমান হোসেন, গার্ড রাকিবুল হাসানকে প্রায় সময় অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করা হতো। 

দপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, অধীনস্থদের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর সম্পর্ক প্রায় শূন্যের কোঠায়। অফিসের নির্ধারিত পিয়ন-কর্মচারীদের পরিবর্তে পছন্দের লোকজন দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে এপিপিভুক্ত প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার কাজ নিয়ে। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, গাজীপুরে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ঠিকাদার থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কাজ বাইরের পরিচিত ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি সরকারি স্থাপনা ও থানার কাজও স্থানীয়দের পরিবর্তে বাইরের ঠিকাদারদের দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ ঢাকায় বসে নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে পরিচালনার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। জুন ফাইনালে এপিপির বরাদ্দ ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ দেখিয়ে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অডিট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা উৎকোচ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাসার কাজ করানোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হেজবুল কবির বলেন, বাউন্ডারি ওয়াল নিয়ে সমস্যা ছিল। নিরাপত্তার জন্য বাউন্ডারি করেছি। টেন্ডারের কাজ স্থানীয় ঠিকাদাররাই বেশি পেয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, বাইরের নিজস্ব ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার বিষয়টি ভুল কথাবার্তা। ঢাকায় থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার সার্কেল অফিস ও জোন অফিস ঢাকায়। এ কারণে থাকতে হয়।

টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বাসায় নেওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য, অফিসে ফাইল রাখলে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণেই বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসে সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এই অফিসে একটা সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। সর্বনিম্ন যারা রয়েছেন, তারাও সাত থেকে আট কেউ ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। ওই কর্মচারী  সিন্ডিকেট আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব বলছে। এপিপির অর্থ ‘অ্যাডজাস্ট’ দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি, জুন ফাইনালে এপিটির অ্যাডজাস্টের ব্যাপারে তেমন কোন ব্যাখ্যা দেনটি তিনি।  তবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার, বাসভবনের কথিত ৩০ লাখ টাকা ব্যয়, কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ, টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং অডিট কর্মকর্তাদের উৎকোচ দেওয়ার অভিযোগ বিষয়ে তিনি পৃথক কোনো ব্যাখ্যা দেননি। অভিযোগগুলো কর্মচারীদের ষড়যন্ত্র যা সঠিক নয় দাবি করেন হেজবুল কবির।

স্থানীয় ঠিকাদার ও কর্মচারীদের দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তাদের মতে, গত দেড় বছরের হাজিরা রেজিস্টার, সিসি ক্যামেরা,  সরকারি গাড়ির লগবুক, জ্বালানি হিসাব, বাসভবন সংস্কারের নথি, এপিপি বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়, টেন্ডার-কার্যাদেশ, ঠিকাদার নির্বাচনের নথি, বিল-ভাউচার ও অডিট নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন