Logo

সারাদেশ

রংপুরে চার খুন

হত্যার স্থান, সময় ও কারণ নিয়ে পুলিশ কমিশনারের নতুন ভাষ্য

Icon

রংপুর ব্যুরো

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৯:১৯

হত্যার স্থান, সময় ও কারণ নিয়ে পুলিশ কমিশনারের নতুন ভাষ্য

ছবি: সংগৃহীত

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাসার তৃতীয় তলার খোলা ছাদে হত্যা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তার বক্তব্য, পরে মা ও মেয়ের লাশ ছাদের গেটের ভিতরে সিঁড়িতে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা না যায়। ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে আসামি সিদ্ধার্থ দাসকে দেখে ফেললে তাকেও হত্যা করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় রংপুর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনের জন্য যেতেন গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পাশের বাড়ির ছাদ ফাঁকা থাকলেও গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে দেয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। এ কারণে তারা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতেন।

সিদ্ধার্থর জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এটি তাদের জীবনে একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা সেবনের ঘটনা। দিনের আলো ফোটার পর সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে কী করিস?’ তখন তাদের মাথা কাজ করছিল না। আত্মসম্মানের ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দিয়ে তাকে হত্যা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মাবুদ আরও বলেন, ‘সম্ভবত স্যারের (গণপতি চক্রবর্তী) স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ পেয়ে তখন ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার করলে মুগ্ধ গণপতির গলায় থাকা গামছা দিয়ে স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ এক হাতে মেয়ের গলা এবং অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরেন। পরে দুজন মিলে গামছা দিয়ে মেয়ের গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। তাতেও তার মৃত্যু না হলে কবুতরের খাবার রাখার বাক্সের পাশ থেকে রশি এনে গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন।’

এরপর ছাদে পাওয়া একটি পুরোনো প্লায়ার্স (বৈদ্যুতিক তার কাটার যন্ত্র) নিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিচতলায় যান এবং বিদ্যুতের তার কেটে দেন। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে সেটি যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে কারণে তারা বিদ্যুতের তার কেটে দেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, এরপর সিদ্ধার্থ আবার ছাদে গিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ের লাশ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেন। পাশের বাড়ির ছাদ মাত্র দুই ফুট দূরে হলেও সেখান থেকে যেন লাশ দেখা না যায়, সে জন্য এভাবে রাখা হয়। দুই তরুণ গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে ঢোকার পর তার ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে দেখে জিজ্ঞাসা করে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ পাশের বাড়ির কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারেÑ এমন আশঙ্কায় কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে শিশুটিকেও হত্যা করা হয়।

আগের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নতা: গত রোববার একই স্থানে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার গ্রেপ্তার দুই তরুণের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলেছিলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে ভোরে বাসার ছাদে, তার স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। তখন বলা হয়েছিল, ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটির ওপর হামলা চালানো হয়।

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে কমিশনার বলেন, ‘আমরা এর আগে বলেছিলাম বাচ্চাটা ঘুমিয়ে ছিল, তারা ঘুমন্ত বাচ্চার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- এটা তাদের থেকে যেটুকু আমরা বক্তব্য পেয়েছিলাম, তখন আমরা সেটুকু বলেছিলাম। কোর্টে গিয়ে তারা বলেছে, বিজ্ঞ আদালতে তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে, বাচ্চাটা ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে।’

হত্যার কারণেও নতুন তথ্য: হত্যার কারণ নিয়ে আগের বক্তব্য থেকে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। গত রোববার তিনি বলেছিলেন, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ইয়াবা সেবনে বাধার পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে সিদ্ধার্থর অসন্তোষও থাকতে পারে।

সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তীরা সিদ্ধার্থর পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিলেন। সেই জমি তুলনামূলক বেশি দামে কেনা হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের শরিকরা তাদের প্রাপ্য টাকা পাননি- এমন একটি বিষয় তারা তদন্ত করে দেখছেন। এ নিয়ে সিদ্ধার্থের মনে ক্ষোভ থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্তে দেখা হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের এবং গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে রাস্তাঘাটে দেখাসাক্ষাৎ হলেও বাসায় যাতায়াত বা ঘনিষ্ঠ মেলামেশা ছিল না। এটিও দুই তরুণের মনে কোনো ক্ষোভের কারণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রশ্নের মুখে সংবাদ সম্মেলন: লিখিত বক্তব্য পাঠ করার পর পুলিশ কমিশনারকে প্রশ্ন করতে থাকেন সাংবাদিকরা। তবে তিনি মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। এতে হত্যাকাণ্ডের স্থান, সময় ও কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তনের বিষয়ে আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ না থাকায় সাংবাদিকরা প্রতিক্রিয়া জানান।

পুলিশ কমিশনারের উদ্দেশে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘যদি প্রশ্নের জবাব দিতে না পারেন, তাহলে অফিসে নিজের বক্তব্য ভিডিও করেই পাঠাতে পারতেন।’

ধর্ষণের আলামত মেলেনি, শ্বাসরোধেই সবাইকে হত্যা: ময়নাতদন্তে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। যে নারী ভিকটিম আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওনাদের ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলে মানুষের বীর্য ও মলমূত্র বেরিয়ে আসে। আমরা দেখেছি একজন ডোম বলেছিলেন বীর্য পাওয়া গেছে। আসলে ওই বীর্য ছিল ডেডবডির। 

তিনি আরও বলেন, দখিগঞ্জ শশ্মানের কেয়ারটেকার ছিলেন বিদ্যুৎ দাস। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন যে, মুগ্ধ দাস তার কাছে গিয়ে বলেন দাদা আমাকে পানি দেও, আমি ও সিদ্ধার্থ স্যারসহ চারজনকে হত্যা করেছি। 

আদালতে মুগ্ধ-সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্তের জবানবন্দি: শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামে এক যুবক। তিনি মামলার গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু। হত্যাকাণ্ডের রাতে তার বাসায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন সীমান্ত।

রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সীমান্ত কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি স্থানীয় একটি কাপড়ের দোকানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলী বলেন, সীমান্ত আদালতে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে মিলেছে। আসামিরা সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিল বলে তথ্য দিয়েছিল। সীমান্তও আদালতে একই তথ্য জানিয়েছেন। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন