রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলি
উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতনিধি
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২১:১৫
কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় পাঁচ বছরের এক শিশু নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় তিন নারীসহ আরও ছয়জন আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্প-৮ ইস্টের বি-৪০ ও বি-৪১ ব্লক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষের সময় মোজাহেদ (৫) নামের শিশুটি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত মোজাহেদ ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর আলমের ছেলে।
এ ঘটনায় তিন নারীসহ ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) উপ-অধিনায়ক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) ও আরএসওর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো নতুন নয়। ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সময়ে হত্যা, গোলাগুলি, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের ঘটনা সামনে এসেছে।
সরকারি নথি ভিত্তিক সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৯২টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ২৩ জন, ২০১৯ সালে ৩২ জন, ২০২০ সালে ১৬ জন, ২০২১ সালে ৩০ জন, ২০২২ সালে ৪৪ জন, ২০২৩ সালে ৮৩ জন, ২০২৪ সালে ২২ জন, ২০২৫ সালে ৩০ জন এবং ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১২ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
এই হিসাবে ২০২৩ সালেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ক্যাম্পগুলোতে ৮৩ জন নিহত হন।
তবে এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলিতে, ছুরিকাঘাতে কিংবা অন্যান্য উপায়ে কতজন নিহত হয়েছেন-তার পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রভিত্তিক সরকারি হিসাব প্রকাশিত না থাকায় এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে না।
এদিকে ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনায় সাধারণ বাসিন্দারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। সর্বশেষ গোলাগুলির ঘটনায় পাঁচ বছরের শিশুর মৃত্যু এবং নারীসহ ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনা ক্যাম্পের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ ধরনের ঘটনার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের দাবি, ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আশপাশের স্থানীয় এলাকাগুলোতেও নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে সর্বশেষ ঘটনায় আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) ও আরএসওর মধ্যে গোলাগুলির কথা পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছে। ফলে ঘটনার সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত, সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ কী এবং কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে-এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
স্থানীয়র প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে বসবাসরত সাধারণ রোহিঙ্গা ও ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সর্বশেষ গোলাগুলিতে একটি শিশুর প্রাণহানি আবারও প্রশ্ন তুলেছে-ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।
বিকে/মান্নান

