Logo

অর্থনীতি

সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজে কোটি কোটি টাকার অবাস্তব সম্পদ!

Icon

এম এম হাসান

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৩

সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজে কোটি কোটি টাকার অবাস্তব সম্পদ!

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আর্থিক হিসাবে কোটি কোটি টাকার অবাস্তব সম্পদ দেখানোর অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষক। কিছু ভুয়া সম্পদ দেখানোর পাশাপাশি আদায় অযোগ্য সম্পদ দেখিয়ে কোম্পানির মুনাফা চিত্র পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে বড় অংকের ঋণ বিতরণ করলেও তা দীর্ঘ বছরে সমন্বয় করা হচ্ছে না। 

কোম্পানির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষায় এমন সব অভিযোগ তুলে এনেছেন নিরীক্ষক। আলোচিত অর্থবছরের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিল নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এস এইচ তালুকদার এফসিএ, পার্টনার এবং ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনারস চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। 

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ বিদেশি গ্রাহকের কাছে ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে কয়েক বছর ধরে দেখিয়ে আসছে। তবে এ নিয়ে প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। যাতে ওই অর্থের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কাঁচামাল সরবরাহকারীকে ২৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদানের দাবি করলেও তার সত্যতা পায়নি নিরীক্ষক।

এদিকে কোম্পানিটির নামে গ্রুপের অন্য কোম্পানি থেকে দুই কোটি ২০ লাখ টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে, যা কয়েক বছর ধরে দেখিয়ে আসছে, কিন্তু পরিশোধ করা হচ্ছে না। অনুরূপভাবে গ্রুপের অন্য কোম্পানি থেকে সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজের চার কোটি ২৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। যা কয়েক বছরে ধরে একইভাবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু পরিশোধ করা হচ্ছে না। এ ছাড়া কোম্পানিটি এনআইপি কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে দুই কোটি ৩৩ লাখ টাকা পাওনা দাবি করলেও তার স্বপক্ষে নিরীক্ষককে প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি।

নিরীক্ষক জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকার কাঁচামাল কেনার তথ্য প্রকাশ করলেও তার স্বপক্ষে নিরীক্ষককে প্রমাণাদি দিতে পারেনি সোনালি আঁশ কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে ২৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার মজুদ পণ্য ছিল বলে আর্থিক হিসাবে দেখায়। তবে ওই মজুদ পণ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক। কারণ কোম্পানিটিতে মজুদ পণ্যে অগোছালো এবং এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

আর্থিক হিসাবে বর্ণিত নোট-২.২১ অনুযায়ী, এ কোম্পানিতে প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে, পরিচালনায় ট্রাস্টিও আছে এবং সমান আট দশমিক ৩৩ শতাংশ হারে কোম্পানি ও কর্মীরা এ ফান্ডে অংশীদার। 

তবে নিরীক্ষক দাবি করছে, কোম্পানিটিতে স্থায়ী এক হাজার ৫৭৭ জন কর্মীর জন্য বেসিক বেতনের আট দশমিক ৩৩ শতাংশ হারে এ ফান্ড গঠন করা হয়নি। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে এক কোটি ৯ লাখ টাকার শ্রমিক ফান্ড রয়েছে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী তা বিতরণ করেনি। এমনকি কোম্পানিটিতে এ বিষয়ে পৃথক কোনো বোর্ড, দলিল বা নিয়ম নেই।

নিরীক্ষকের অভিযোগ বিষয়ে জানতে সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি সচিব মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানি ভুয়া সম্পদ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। যাতে পরবর্তীতে ওইসব ভুয়া সম্পদ আদায় হয় না বলে লোকসান দেখায়। প্রকৃতপক্ষে কোম্পানি থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে ওইসব অস্তিত্বহীন ভুয়া সম্পদ দেখানো হয়। নিরীক্ষকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে এমন দুর্বল কোম্পানিগুলোর সম্পদ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরো বেশি গুরুত্বারোপ করা উচিত।

ধারাবাহিক মুনাফা বাড়ছে, শেয়ারদরেও প্রভাব : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোনালী আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ ধারাবাহিকভাবে মুনাফা বৃদ্ধির তথ্য দিয়েছে। 

২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানির নিট মুনাফা হয় ৩১ লাখ টাকা। পরের বছর তা বেড়ে এক কোটি ছয় লাখ, পরের বছর আরো বেড়ে দুই কোটি ৯ লাখ এবং তার পরের বছর আরো বেড়ে তিন কোটি ৫১ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয়। আর সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির নিট মুনাফা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হয়েছে। আর এই বড় মুনাফা অর্জনের বছরেই কোম্পানির বিরূদ্ধে নানা অভিযোগ তুললো নিরীক্ষক।

অস্বাভাবিক এই মুনাফার তথ্যে মাত্র ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এবং গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য ৩৬ টাকার একটু বেশি থাকা কোম্পানিটির শেয়ারদর গতকাল মঙ্গলবার ১৬১ টাকার উপরে লেনদেন হয়েছে। গত এক বছরে শেয়ারদর সর্বোচ্চ ২৫৭ টাকা পর্যন্ত উঠেছিলো। 

১৯৮৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সোনালি আঁশের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণির (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৬৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোম্পানিটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় শেয়ারবাজারের মালিকানায় থাকা বিনিয়োগকারীদের ঘারে বড় অংশ চাপবে। 

বিকেপি/এমএইচএস 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

শেয়ারবাজার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর