Logo

অর্থনীতি

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় সরকার

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২১

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় সরকার

দেশে বর্তমানে অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের বিড়ম্বনা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার ফলে জ্বালানি সরবরাহের চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের যে সংকট চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্প খাত- সব জায়গায় ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা এখন ভয়াবহ। অনেক এলাকায় দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

এ পরিস্থিতিতে দেশের চলমান জ্বালানি সমস্যার সমাধানে পরামর্শ গ্রহণের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাব দিলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সমর্থন দেন। এ সময় যৌথভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অভিমত উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী এই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল বিরোধীদলীয় নেতা দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার তাপ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা জানান, তাদের কাছে কিছু পরামর্শ আছে এবং সরকারি ও বিরোধী দল একসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারে। আমি বলতে চাই— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সবসময় দেশের ও মানুষের স্বার্থে যে কারও সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত।’

এদিকে, দেশের কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এবং গ্রাম-শহরের বিদ্যুৎ বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায়ও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্তও সরকার নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা বলেছেন, দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। জ্বালানি সংকটও অনেক বেশি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে জ্বালানি সংকট নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়ে এ তথ্য জানান।

বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য আসলে সেখানে বিশ্বাস অর্জন করতে দেশবাসীর কিছুটা সময় লাগবে। তবে বর্তমান সরকার তাদের শপথের মর্যাদা এবং পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানের এই বিদ্যুৎ সমস্যা একদিনের নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল। বর্তমানে কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গড়মিল রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট,যার বিপরীতে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে দেশজুড়ে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। 

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে ফসল কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনা সমুন্নত রাখতে রাজধানী ঢাকায় প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

বেড়েছে বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি সংকটও অসহনীয়: বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা বলেছেন, গত বুধবার বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৩,৬৮১ মেগাওয়াট। ২০৮৬ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। ফোরকাস্টিং (পূর্বাভাস) হিসেবে দেখেছি, আজ (গতকাল) চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মতো। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বেড়েছে, বেড়েছে গরমও। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটও অনেক বেশি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।

গতকাল সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছি, এসি ব্যবহার করছি—যে কারণে বিদ্যুতের সার্বিক চাহিদা বেড়েছে। আজ উৎপাদনের প্রজেকশনে দেখা যাচ্ছে আমরা প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব। তারপরও প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকবে।’

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আদানি থেকে যে বিদ্যুৎ আনি, কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ। ২৬ এপ্রিল সেকেন্ড ইউনিট ঠিক হলে বিদ্যুৎ পাবো। বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ারের একটি আইপিপি প্ল্যান্ট আছে। সেখানেও একটি ইউনিট বিকল হওয়ার কারণে প্রায় সাড়ে ছয়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি। আগামী ২৮ এপ্রিল এটিও ঠিক হয়ে যাবে। এ সময় প্রায় ১৩০০ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ দিতে পারবো।

ভারত থেকে এলো আরও ৭ হাজার টন ডিজেল: দিনাজপুরের পার্বতীপুর মেঘনা রেলহেড অয়েল ডিপোতে ভারত থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে আরও ৭ হাজার টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। এ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের রিসিপ্ট টার্মিনালে চলতি মাসে তৃতীয় দফায় ভারত থেকে ডিজেল এসে পৌঁছাল। জেলার পার্বতীপুর রেলহেড মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন্স) কাজী রবিউল আলম জানান, বৃহস্পতিবার (গতকাল) সকাল সাড়ে ১০টায় ভারত থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পার্বতীপুর মেঘনা রেলহেড ডিপোতে ৭ হাজার টন তেল এসে পৌঁছেছে।

তিনি জানান, গত ২০ এপ্রিল সোমবার রাত ৮টায় ভারতের শিলিগুড়ি নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপ লাইনে ডিজেল পাম্পিং শুরু হয়েছে। ৬৫ থেকে ৭০ ঘণ্টার মধ্যে এসব ডিজেল দিনাজপুর পার্বতীপুর রেলহেড মেঘনা অয়েল ডিপোতে এসে পৌঁছায়।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ৫ হাজার টন ডিজেল ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড কেন্দ্র থেকে দিনাজপুর পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে এসে পৌঁছায়। এ নিয়ে চলতি মাসে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ৩ বারে ২০ হাজার টন ডিজেল পৌঁছেছে।

সূত্র জানায়, এই নিয়ে চলতি বছরে সর্বমোট ৪২ হাজার টন ডিজেল ভারত থেকে পাইপ লাইনে এসে পৌঁছেছে। চলতি এপ্রিল মাসে মোট ৪টি চালানের মাধ্যমে ভারত থেকে ২৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে। এরমধ্যে গত ১১ এপ্রিল ৮ হাজার টন, ১৯ এপ্রিল ৫ হাজার টন এবং আজ ৭ হাজার টন ডিজেল এসেছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত চারটি চালানে ভারত থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার টন ডিজেল এসে পৌঁছায়।

গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা: জ্বালানি সংকটে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সরকারি তথ্যমতে, কয়েক দিন ধরে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রকৃত ঘাটতি সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে গত বুধবার।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। যদিও বেসরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত লোডশেডিং চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। একই সময়ে পিজিসিবির ওয়েবসাইটে ছয় বিতরণ কোম্পানির সম্মিলিত লোডশেডিং দেখানো হয় ২ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট।

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।

আদানি সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া গেলে বড় দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করা হয়। মেরামত শেষ হতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। মঙ্গলবার রাত ১২টায় আদানি থেকে ১ হাজার ৪৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও রাত ২টায় তা কমে ৭৬৪ মেগাওয়াটে নেমে আসে। গত বুধবার বিকেল ৪টার তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ ছিল ৭৪৬ মেগাওয়াট। এতে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে দেশে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে। উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধানের কারণে এ সময় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হয়। দুপুরের পর গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়তে থাকে এবং রাতে তা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পিজিসিবি রাতের জন্য সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট নির্ধারণ করেছিল। মঙ্গলবার রাত ৯টায় চাহিদা ১৬ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট—ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট।

পিজিসিবির তথ্য বলছে, দেশে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে ১৩টি, জ্বালানি তেলের অভাবে ৯টি এবং রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৮টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১৭টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেগুলো থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। খরচ বেশি হওয়ায় ডিজেলচালিত পাঁচটি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হলেও গ্যাস সংকটে সেখান থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে। চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও মোট উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় ঘাটতি পূরণে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

মাসের শুরুতে লোডশেডিং বাড়লেও ঢাকায় তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে গত বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গেছে। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গাজীপুর, কুষ্টিয়া, নাটোর, নোয়াখালী, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেক বা তারও কম হওয়ায় দিন-রাত দফায় দফায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। টঙ্গী, কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈর এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার কারখানায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা মালিকদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে উৎপাদনে ধস নামবে এবং ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সংকট দেখা দিতে পারে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১৬ থেকে ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৭ মেগাওয়াট। ফলে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও রোগীরা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নাটোরে দিন-রাতে চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। 

নোয়াখালীতে ৯ লাখের বেশি গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদার তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৩০-৪০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকার পর দীর্ঘ সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের হাতপাখা দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মার্চ মাসের বকেয়া বিল পরিশোধে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাজেট অনুবিভাগ-১ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ অর্থ স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরপিপি) বিল পরিশোধে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া হবে। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বিদ্যুৎ ভর্তুকি খাত থেকে বরাদ্দ করা হবে। তবে এই ভর্তুকির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সরকারি অনুমোদনবিহীন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোকে দ্রুত অনুমোদন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের সংকট নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। 

তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, একটি আমদানিকৃত পাওয়ার প্লান্ট এবং একটি কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বর্তমানে বন্ধ থাকায় সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এগুলো পূর্ণ উৎপাদনে ফিরলে সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। জনগণের এই সাময়িক কষ্টের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা বলেছেন, সংকট আমাদের আছে। সংকট আমরা সবাই সম্মিলিতভাবেই প্রতিহত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা আশা করি, আমরা যে জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলি, আপনারা সবাই এ বিষয়টা প্রচার করবেন। আমরা যখন এসি চালাব, তখন এসিটা যাতে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। আমরা দিনের বেলা কার্টেনগুলো, আমরা জানালা-পর্দাগুলো তুলে রাখব, যাতে আমাদের লাইট কম লাগে। আসলে আমরা যদি জাতি হিসেবে সাশ্রয়ী জাতি না হই, তাহলে এই সংকটটা থেকেই যাবে। আমরা সবাই মিলে এই সংকটকে উত্তরণ করবো।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন