দেশের বাজারে আবারও বড় পতন ঘটেছে সোনা ও রুপার দামে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (পাকা সোনা) দাম কমায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
শনিবার সকাল ১০টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর
করা হয়েছে। চলতি মে মাসে এসে সোনার বাজারে বড় ধরনের এই দরপতন ক্রেতাদের মাঝে কিছুটা
স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর আগে শুক্রবারও দেশের বাজারে সোনার দাম এক দফা কমানো হয়েছিল।
ফলে শুক্র ও শনিবার—এই টানা দুই দিনে দেশের বাজারে ভালো মানের সোনার দাম ভরিপ্রতি সর্বোচ্চ
৬ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত কমল।
শনিবার সকালে বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি
অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির এক জরুরি বৈঠকে সোনার দাম পুনর্নির্ধারণের
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মূল্য তালিকা গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
বিশ্ববাজারে সোনার দামের বড় ধরনের পতন
এবং স্থানীয় বাজারে পাকা সোনার সরবরাহ ও দামের বিষয়টি বিবেচনা করে জুয়েলার্স সমিতির
নেতারা এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সর্বশেষ গত ৭ মে দেশের বাজারে সোনার দাম
সর্বোচ্চ ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতির
কারণে টানা দুই দিনে সেই বাড়তি দামের চেয়েও বেশি দরপতন ঘটল।
নতুন দাম অনুযায়ী, দেশের বাজারে এখন থেকে
সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনা কিনতে ক্রেতাদের
গুণতে হবে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা। শুক্রবার
পর্যন্ত এই মানের সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা। অর্থাৎ, এক দিনেই ২২ ক্যারেটের
সোনার দাম ভরিতে কমেছে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা।
একইভাবে কমেছে অন্য সব ক্যারেটের সোনার
দামও। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ৪ হাজার ১৪১ টাকা কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ
করা হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা, যা আগে ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭২ টাকা। ১৮ ক্যারেটের
প্রতি ভরি সোনার দাম ৩ হাজার ৫৫৮ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা নির্ধারণ করা
হয়েছে, যার পূর্বমূল্য ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৫ টাকা।
এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার
দাম ২ হাজার ৯১৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকা, যা গতকাল
পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ টাকায়।
সোনার পাশাপাশি আজ দেশের বাজারে বড় পতন
হয়েছে রুপার দামেও। ক্যারেটভেদে রুপার দাম ভরিতে সর্বোচ্চ ১৭৫ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ১১৭ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা
হয়েছে ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৫ হাজার
৩৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ১১৭ টাকা কমিয়ে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সনাতন
পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ১১৭ টাকা কমিয়ে ৩ হাজার ৪৪১ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বরাজনীতি
ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণেই বিশ্ববাজারে সোনার এই বড় পতন। বিশেষ করে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির
কিছু পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। যার ফলে
বিশ্ববাজারে সোনার দামের বড় পতন হয়েছে। মাত্র এক দিনেই অর্থাৎ ১৫ মে বিশ্ববাজারে প্রতি
আউন্স সোনার দাম প্রায় ১৩৭ ডলার কমে গেছে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে গত ৩০ দিনে আন্তর্জাতিক
বাজারে সোনার দাম কমেছে ১০৮ ডলার। বিশ্ববাজারে সোনার দাম প্রতিদিন ওঠানামা করার কারণে
সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই দেশের বাজারে এই বড় সমন্বয় করা হলো।
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,
দেশের বাজারে সোনার দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। চলতি ২০২৬
বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশের বাজারে সর্বমোট ৬৫ বার সোনার দাম সমন্বয়
করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে ৩৫ দফা, আর কমানো হয়েছে ৩০ দফা। এর আগে
গত ২০২৫ সালজুড়ে দেশের বাজারে রেকর্ড ৯৩ বার সোনার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল; যার মধ্যে
৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং কমানো হয়েছিল ২৯ বার।
উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও ডলার
সংকটের কারণে দেশের বাজারে গত ২৯ জানুয়ারি সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি
ভরি সোনার দাম এক লাফে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ০১ টাকা নির্ধারণ করা
হয়েছিল। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার দামের সর্বোচ্চ রেকর্ড। সেই রেকর্ড মূল্যের
পর থেকে ধাপে ধাপে কমতে কমতে আজ সোনার দাম ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ঘরে এসে নামল। জুয়েলার্স
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দামের এই পতন অব্যাহত থাকে, তবে দেশের
বাজারে সোনার দাম আরও কমতে পারে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

