Logo

অর্থনীতি

আমের বাজারে ভিন্ন চিত্র

সাতক্ষীরায় হাসছেন চাষিরা, রাজশাহীতে রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা

Icon

সাতক্ষীরা ও রাজশাহী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ২০:৪৫

সাতক্ষীরায় হাসছেন চাষিরা, রাজশাহীতে রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা

আম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দেশের দুই বিখ্যাত আম উৎপাদনকারী অঞ্চল সাতক্ষীরা ও রাজশাহীতে শুরু হয়েছে মধুমাসের তোড়জোড়। তবে মৌসুমের শুরুতে এই দুই অঞ্চলের আম চাষিদের মাঝে বিরাজ করছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। একদিকে সাতক্ষীরায় হিমসাগর’ সংগ্রহের ধুম ও বিদেশে রপ্তানি শুরুর খবরে চাষিদের মুখে যখন হাসির ঝিলিক, তখন অন্যদিকে রাজশাহীতে আমের বাম্পার ফলন সত্ত্বেও রপ্তানি বন্ধ ও লোকসানের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ চাষিরা আমবাগান কেটে সাবাড় করছেন। আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী এবং আগাম জাতের আমের জন্য প্রসিদ্ধ সাতক্ষীরার মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন:

সাতক্ষীরায় হিমসাগরের সুবাস ছড়াচ্ছে ইউরোপে: সাতক্ষীরার আম চাষিদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রশাসনের নির্ধারিত আম ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী শুরু হয়েছে জেলাটির সবচেয়ে জনপ্রিয় আম হিমসাগর’ বাজারজাতকরণ। শুক্রবার সকাল থেকে জেলার বাগানগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুস্বাদু আম সংগ্রহের উৎসবে মেতেছেন চাষিরা।

মৌসুমের শুরুতেই স্থানীয় বাজারে এই আমের চাহিদা এখন তুঙ্গে। বর্তমানে প্রতি মণ হিমসাগর আম পাইকারি দরে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারদর ভালো থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা বেশ খুশি। সাতক্ষীরার আমের সুবাস এখন কেবল দেশের ভেতরেই নয়, পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশের মাটিতেও। নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সাতক্ষীরার আমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সাতক্ষীরা শহরের কুকরালী এলাকার আম চাষি হাফিজুল ইসলাম খোকার বাগান থেকে ইংল্যান্ড ও ইতালির উদ্দেশ্যে চার টন হিমসাগর আম রপ্তানি করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, বর্তমানে হিমসাগর আম পুরোপুরি পরিপক্ব এবং বাজারজাতকরণের জন্য উপযুক্ত। সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী চাষিরা আগামী ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি জাতের আম সংগ্রহ ও বিক্রি করতে পারবেন। উল্লেখ্য, গত ৫ মে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ জাতের আম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে জেলাটিতে এ বছরের আম মৌসুম শুরু হয়।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৭০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

রাজশাহীতে দাম ও রপ্তানি নিয়ে চরম শঙ্কা: সাতক্ষীরার উল্টো চিত্র দেখা গেছে উত্তরের জেলা রাজশাহীতে। পোকার কবল ও অনাবৃষ্টি থেকে আম রক্ষা করতে রাজশাহীর চাষিদের এবার গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। তাদের পরম যত্নে প্রতিটি গাছেই এখন ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এবার রাজশাহী জেলায় ৭৮০ কোটি টাকার ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

তবে ফলন ভালো হলেও দাম ও বাজারজাতকরণ নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটছে রাজশাহীর ১ লাখ৪০ হাজারেরও বেশি চাষির। তাদের অভিযোগ, দেশে পেয়ারার কেজি ১০০ টাকা হলেও কেউ আপত্তি করে না, কিন্তু হিমসাগর বা ল্যাংড়ার মতো সুমিষ্ট আম ৪০ টাকা কেজিতে কিনতে গেলেও ক্রেতারা দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

রাজশাহীর আম চাষিদের হতাশার সবচেয়ে বড় কারণ হলো গত দুই বছর ধরে বিদেশে আম রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ থাকা। বাঘা পৌরসভার আম রপ্তানিকারক শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, "আমরা বাঘার ২১ জন চাষি উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা মেনে বিশ্বমানের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করি। কিন্তু অতিরিক্ত বিমান ভাড়ার কারণে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারছি না। পাকিস্তান ও ভারত থেকে এক কেজি আম ইউরোপে পাঠাতে যেখানে বিমান ভাড়া লাগে ২০০ টাকা, সেখানে আমাদের গুনতে হয় ৪০০ টাকা! এই ভাড়ার বৈষম্যের কারণে ২০২৩ সালের পর রাজশাহী থেকে আর কোনো আম বিদেশে যায়নি। এবারও আমরা রপ্তানিযোগ্য আম চাষ করেছি, কিন্তু কোনো আশা দেখছি না।"

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক পাপিয়া রহমান মৌরীও বিষয়টি স্বীকার করে জানান, বিমান ভাড়াসহ কিছু নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার কারণে ২০২৩ সালের পর থেকে বিদেশে আম রপ্তানি থমকে আছে, তবে কৃষি বিভাগ চাষিদের আন্তর্জাতিক মানের আম উৎপাদনে প্রশিক্ষণ দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে রাজশাহী কৃষি বিভাগ আম নামানোর একটি সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। সেই অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে গুটি আম নামানো শুরু হয়েছে। এরপর ২২ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে লক্ষ্মণভোগ ও রানীপছন্দ, ৩০ মে থেকে হিমসাগর, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই বারি-৪, ১০ জুলাই আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে শেষ জাতের গৌড়মতি আম নামানো যাবে।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন