Logo

অর্থনীতি

‎ভালো কোম্পানির অভাবে কুক্ষিগত হচ্ছে শেয়ারবাজার

Icon

‎এম এম হাসান

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৭

‎ভালো কোম্পানির অভাবে কুক্ষিগত হচ্ছে শেয়ারবাজার

‎# গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মা ও রবির দখলে এক-পঞ্চমাংশ বাজার মূলধন

‎# প্রায় ৪০ শতাংশ বাজারের আধিপত্য ১০ কোম্পানির কাছে

‎# জিডিপি অনুপাতে প্রতিবছর পিছিয়ে যাচ্ছে শেয়ারবাজার

‎# ভালো শেয়ারের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে

‎# বাজারে শতকোটি ডলারের কোম্পানি ৫টি, পাকিস্তানে যা ৯টি

দেশের বড় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৩৬০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানি অতি দুর্বল ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভালো কোম্পানির সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটিতে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল কোম্পানির ভিড়ে শীর্ষ ১০ কোম্পানির দখলে চলে এসেছে বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ আধিপত্য। এরমধ্যে শুধুমাত্র তিন কোম্পানির বাজার মূলধনের পরিমান মোট বাজার আকারের প্রায় ২০ শতাংশ।

‎বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর শেষে যা ছিল ৩ লাখ ২৯ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে বছরের ব্যবধানে কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৫ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা বা প্রায় ১১ শতাংশ। সার্বিকভাবে বাজার মূলধনে এই বড় প্রবৃদ্ধি আসলেও এতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির ভূমিকাই বেশি।

‎বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের শেয়ারবাজারে দুর্বল কোম্পানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এতে বহুবছর ধরেই মুষ্টিমেয় কোম্পানির দখলে বাজারের আধিপত্য থেকে যাচ্ছে। ওই কোম্পানিগুলোতে দরপতন হলে পুরো বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার ওই কোম্পানিগুলোর দরবৃদ্ধি হলে বাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে দ্রুত মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো ও বড় কিছু কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) চিন্তা করা যেতে পারে। মানসম্পন্ন ও বড় কোম্পানির অভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো শেয়ারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় দেশের শেয়ারবাজার ছোটই রয়ে গেছে।

‎এ বিষয়ে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশেকুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, মাত্র ১০টি কোম্পানি বাজার মূলধনের প্রায় ৪০ শতাশ দখল করে আছে, এর বড় কারণ হলো বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো আইপিও আসেনি। সর্বশেষ ২০২১ সালে বড় আইপিও হিসেবে রবি আজিয়াটা এসেছিলো। এরপর আর কোন বড় কোম্পানি আসেনি। শর্তের কারণে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হলেও উৎপাদন খাতের বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা না গেলে বাজার মূলধনে এই অসমতা সহজেই দূর হবে না। বাজারের স্বার্থে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বড় ও ভালো কোম্পানিগুলোতে তালিকাভুক্ত করতে উদ্যোগ নেয়া।

‎ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শীর্ষ ১০ কোম্পানির এই আধিপত্যে এটি স্পষ্ট ধারণা দেয় যে আমাদের বাজারে বড় কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম। পর্যাপ্ত ভালো ও বড় কোম্পানি না থাকায় বিনিয়োগকারীরাও বাজারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। দ্রুত বাজারে মৌলভিত্তিসম্পন্ন শক্তিশালী বড় কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন হলে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

‎শীর্ষ ১০ কোম্পানির কোনটির আধিপত্য কতটা?

‎বাজার মূলধন বিবেচনায় দীর্ঘ বছর ধরে শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে আসছে গ্রামীণফোন লিমিটেড। গত ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের প্রায় ১০ শতাংশ। একই সময়ে ১৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা বাজার মূলধন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এক্সচেঞ্জটির মোট বাজার মূলধনে এই কোম্পানিটির আধিপত্য সাড়ে ৫ শতাংশ। ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি দখলে নিয়ে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রযেছে রবি আজিয়াটা। গত ৩০ জুন শেষে এই কোম্পানিটির বাজার মূলধনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। আর সম্মিলিতভাবে এই তিন কোম্পানির বাজার মূলধন ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ।

‎ডিএসইতে বর্তমানে বাজার মূলধন বিবেচনায় চতুর্থ বড় কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংক। গত ৩০ জুন শেষে ব্যাংকটির বাজার মূলধনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের ৪ শতাংশের বেশি। মোট বাজার মূলধনের প্রায় ৪ শতাংশ দখলে নিয়ে তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। আর ডিএসইর মোট বাজার আকারের ৩ শতাংশের বেশি বাজার মূলধন নিয়ে তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি)। গত ৩০ জুন শেষে এই কোম্পানিটির বাজার মূলধনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা।

‎সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে তালিকায় সপ্তম অবস্থানে থাকা ম্যারিকো বাংলাদেশের বাজার মূলধনের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের প্রায় আড়াই শতাংশ কোম্পানিটির দখলে রয়েছে। আর এই সময় পর্যন্ত ঠিক ২ শতাংশ বাজার দখলে নিয়ে অষ্টম অবস্থানে থাকা ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। গত ৩০ জুন শেষে ৭ হাজার ১১ কোটি টাকা বাজার মূলধন নিয়ে তালিকায় নবম অবস্থানে রয়েছে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, কোম্পানিটির বাজার আধিপত্য ১ দশমিক ৯০ শতাংশ। ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের ১ দশমিক ৮০ শতাংশ দখলে নিয়ে তালিকায় সবশেষে রয়েছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। আলোচিত অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।

‎অর্থনীতির তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে শেয়ারবাজার: চাহিদা অনুযায়ী বড় কোম্পানি না থাকায় অর্থনীতির আকার অনুযায়ী প্রতিবছরই পিছিয়ে পড়ছে শেয়ারবাজার। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইর সার্বিক বাজার মূলধন প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকায় উন্নিত হলেও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে শেয়ারবাজার আরো পিছিয়েছে। আগের অর্থবছরে ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশে থাকলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে এটি কমে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে।

‎বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ বা তার বেশি হয়ে থাকে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতেও এই অনুপাত ৫০ শতাংশ থেকে প্রায় সমান হয়। এই অনুপাত দেখে বুঝা যায় যে, একটি দেশের অর্থনীতির তুলনায় সেই দেশের পুঁজিবাজার কতটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

‎বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন দেশেটি জিডিপির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আর সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত ৯১ থেকে ১২০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই অনুপাত ১২৫ থেকে ১৩৭ শতাংশের মধ্যে মধ্যে ওঠানামা করছে। অথচ বাংলাদেশে যার হার মাত্র ১১ শতাংশের ঘরে। এখানে এটি স্পষ্ট যে, দেশের অর্থনীতির তুলনায় শেয়ারবাজার অবমূল্যায়িত হয়ে রয়েছে।

‎এ বিষয়ে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বড় বাজারমূল্যের কোম্পানির সংখ্যাই খুব কম। এতে সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে বাজার মূলধনের পরিমানও কম। এই বাজারে যদি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি ও মেটলাইফের প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হতো, তাহলে প্রত্যেকটির বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারত। একইভাবে ইউনিলিভার ও স্থানীয় কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো তালিকাভুক্ত হলে এই সমীকরণ পাল্টে যেত। ওই কোম্পানিগুলো না থাকায় বাজারমূলধন-জিডিপি অনুপাতও নিচু অবস্থায় থেকে যাচ্ছে।

‎প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বড় কোম্পানি কম: বর্তমানে বাংলাদেশে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বাজারমূল্যের তালিকাভুক্ত কোম্পানি রয়েছে মাত্র পাঁচটি। এগুলো হলো গ্রামীণফোন (২৮৪ কোটি ডলার), স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস (১৬১ কোটি ডলার), রবি আজিয়াটা (১৩৮ কোটি ডলার), ব্র্যাক ব্যাংক (১২৩ কোটি ডলার) এবং ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ (১০৮ কোটি ডলার)।

‎অন্যদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় তালিকাভুক্ত কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির বাজারমূল্য ৫১৭ কোটি ডলার। দেশটিতে ২০০ কোটি ডলারের বেশি বাজারমূল্যের কোম্পানি রয়েছে ছয়টি এবং ১০০ কোটি ডলারের বেশি বাজারমূল্যের কোম্পানি রয়েছে নয়টি।

‎এ বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের বড় কোম্পানিগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ছোট। ভারতের শীর্ষ ১০টি কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের বড় কোম্পানিগুলোর আকার তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এমনকি শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের ওষুধ কোম্পানিগুলোও আমাদের চেয়ে বড়। এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির হাতে মোট বাজারমূলধনের প্রায় ৪০ শতাংশ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

‎এই বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো বৈশ্বিকভাবে পরিচিত ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারেনি। এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে শুধু মান ধরে রাখলেই হবে না, আকারেও আরও বড় হতে হবে। ইউনিলিভার ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বেশ কয়েকটি বড় ও সফল প্রতিষ্ঠান এখনও শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে। এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা দেশের বৃহৎ কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসলে বাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা-দুটিই বাড়বে।

‎বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন