ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে ‘বিএসইসি (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় তড়িঘড়ি করে সংশোধিত বিধিমালার খসড়া তৈরি করে তাতে জনমত আহ্বান করা হয়। প্রস্তাবনায় ব্যাংক, বীমা ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) জন্য মূল্য-আয় অনুপাত বা ‘পিই রেশিও’র পরিবর্তে ‘পিবি রেশিও’ (প্রাইস টু বুক ভ্যালু) ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়। এতেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। অবশেষে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কের ‘পিবি রেশিও’ বাতিল হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়ে শিথিলতা আনার কথা চিন্তা করছে কমিশন।
খসড়া বিধিমালায় বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘পিবি রেশিও’ ৩ (তিন)-এর অধিক হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। আর বিমা কোম্পানিগুলোর ‘পিবি রেশিও’ যদি ১ (এক)-এর অধিক হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। অর্থাৎ নির্ধারিত দিনে কোনো বিমা কোম্পানির শেয়ারমূল্য যদি সর্বশেষ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের (এনএভিপিএস) তুলনায় বেশি হয়, তাহলে ওই শেয়ারে মার্জিন সুবিধা পাওয়া যাবে না। অথচ, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারমূল্য এনএভিপিএসের তিনগুণ পর্যন্ত হলেও মার্জিন অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিধিমালায় এমন প্রস্তাব দেওয়ার পর ব্যাংক ও বীমা খাতের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিতর্ক এড়াতে কমিশন ‘পিবি রেশিও’ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বিএসইসির একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক, এনবিএফআই ও সাধারণ বীমা খাতে ‘পিবি রেশিও’ চালু না করার সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে জীবন বীমা খাতে ‘পিবি রেশিও’ রাখা হতে পারে। সেক্ষেত্রেও প্রস্তাবনার বাইরে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।
এ বিষয়ে শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, যেহেতু বিষয়টি প্রস্তাবিত বিধিমালায় ‘পিবি রেশিও’ থাকায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে একটি বিতর্কের তৈরি হয়েছে, সেহেতু এটি চালু না করাই ভালো হবে। বিনিয়োগকারীরা এটি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, যা স্পষ্ট। তাই বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ‘পিই রেশিও’ ব্যবস্থা বহাল রাখা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।
গত ১৯ জুলাই ‘বিএসইসি (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধনের লক্ষ্যে খসড়া বিধিমালা তৈরি করে তাতে সংশ্লিষ্টদের মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করে বিএসইসি। এজন্য নির্ধারিত দুই সপ্তাহ সময় এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন কমিশন সভায় সংশ্লিষ্টদের দেওয়া মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি মূল্যায়নের জন্য উত্থাপন করা হবে। পরে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করে তা গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
মার্জিন বিধিমালায় আরও যেসব সুবিধা বাড়ছে: খসড়া বিধিমালায় বলা হয়, ব্যাংক, বীমা ও এনবিএফআই ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির ‘পিই রেশিও’ ৩০-এর ওপরে উঠলে সেটি মার্জিন ঋণ সুবিধা পাওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে। কমিশন এই সীমা বাড়িয়ে ‘পিই রেশিও’ সর্বোচ্চ ৪০ করার চিন্তা করছে। এতে আরও অধিকসংখ্যক সাধারণ কোম্পানি মার্জিন ঋণ সুবিধার আওতায় আসবে।
এ ছাড়া, ফোর্সড সেল বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রেও শিথিলতা আনার চিন্তা করছে কমিশন। বর্তমানে গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইকুইটি ৭০ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল দেওয়া হবে। তবে প্রস্তাবনায় মার্জিন কল পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীকে প্রয়োজনীয় ইকুইটি পুনরুদ্ধারের জন্য তিন কার্যদিবস সময় দেওয়ার কথা বলা হয় এবং ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির সুযোগ রাখা হয়।
কমিশন এখন এই প্রস্তাব থেকে সরে এসে বিনিয়োগকারীর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে আগাম নোটিশ দেওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা চিন্তা করছে। আর ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি শর্ত যুক্ত করতে যাচ্ছে। অবশ্য, ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন সিইও ফোরাম ইকুইটি ৪০ শতাংশে নামলে জোরপূর্বক বিক্রির সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে: এদিকে প্রস্তাবিত বিধিমালায় মার্জিন ঋণদাতাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খসড়ায় স্টকব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপকসহ মার্জিন ঋণদাতাদের মূলধন বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এই সীমা তিন গুণ। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলধন ১০০ টাকা হলে বর্তমানে তারা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে; নতুন নিয়মে তা বেড়ে ৫০০ টাকা হতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার সক্ষমতা ও বাজারের লেনদেন বাড়তে পারে।
এ ছাড়া খসড়ায় মার্জিন ঋণের জন্য গ্রাহকের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম সিকিউরিটিজের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সিইও ফোরাম এটি বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার পাশাপাশি জীবন বীমা ছাড়া সব খাতের জন্য অভিন্ন পিই মানদণ্ডের প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে কোনো একটি শেয়ারে মার্জিন ঋণদাতার সর্বোচ্চ অর্থায়নের সীমা মোট তহবিলের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। তবে এটি করা হলে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে ঋণের ঘনত্ব ও ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কম লভ্যাংশের শেয়ারেও মার্জিন ঋণ সুবিধা: বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভালো মানের শেয়ারের পাশাপাশি ‘বি’ ক্যাটাগরির পাঁচ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ সুবিধা রয়েছে। কমিশন এখন ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির সব কোম্পানির শেয়ারেই মার্জিন ঋণ সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করছে। এতে ‘বি’ ক্যাটাগরির কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ারেও মার্জিন ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে ‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ শ্রেণির কোম্পানি, এসএমই মার্কেটের শেয়ার এবং এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ মার্জিন ঋণের বাইরে থাকবে।
এ ছাড়া, প্রস্তাবিত বিধিমালায় গ্রাহকের ইকুইটির বিপরীতে মার্জিন অর্থায়নের সর্বোচ্চ অনুপাত ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন না রেখে সব ক্ষেত্রে ১:১ (এক অনুপাত এক) নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। যদিও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব নীতি অনুযায়ী এর চেয়ে কম ঋণ দিতে পারবে। আগে পরিস্থিতিভেদে এটি এক অনুপাত এক, এক অনুপাত শূন্য দশমিক পাঁচ ও এক অনুপাত শূন্য দশমিক ২৫ ছিল।
সহজ মার্জিন বিধিমালায় অসুবিধা কী: শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়ানোর লক্ষ্যে মার্জিন বিধিমালা সহজ করার যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এতে বিনিয়োগকারীদের মুখে নতুন করে হাসি ফুটেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি সুখবর হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বাজারে আবারো ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ‘বি’ ক্যাটাগরির কম লভ্যাংশ দেওয়া শেয়ারেও মার্জিন সুবিধা পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে প্রস্তাবনায়। এটি পাস হলে অনেক দুর্বল শেয়ারে মার্জিন সুবিধা পাওয়া যাবে। পরবর্তীতে ওই শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীর প্রাথমিক বিনিয়োগের চেয়েও বেশি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
এ ছাড়া, ‘পিই রেশিও’ প্রস্তাবে থাকা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করা হলে অনেক বেশি কোম্পানি মার্জিন ঋণ সুবিধার আওতায় আসবে। এই অতিরিক্ত সীমার জন্য অনেকগুলো দুর্বল কোম্পানি মার্জিন ঋণ সুবিধা পাবে। এতেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির তৈরি হতে পারে। আর একক শেয়ারে মার্জিন ঋণদাতার সর্বোচ্চ অর্থায়নের সীমা মোট তহবিলের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে কোনো দুর্বল শেয়ারে বিনিয়োগকারী অধিক বিনিয়োগ করে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিনিয়োগকারীর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে আগাম নোটিশ দেওয়া এবং ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির শর্তটি যুক্ত হলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেননা, ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ততক্ষণে মার্জিন ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা দুজনই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য: এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘মার্জিন ঋণের প্রস্তাবটি সর্বশেষ কোন অবস্থায় রয়েছে, সেটি আমার জানা নেই। তবে কমিশন অবশ্যই বাজারবান্ধব সিদ্ধান্ত নেবে।’
সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পিবি রেশিও’ নামটা নতুন শুনে অনেকেই এটি বুঝতে পারছেন না। অথচ এটিও একটি আন্তর্জাতিক প্র্যাকটিস। বিষয়টি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি খসড়া মতামতের জন্য দেওয়া হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। মতামত নেওয়ার পর আপনারা যখন ফাইনাল বিধিমালাটি দেখতে পাবেন, তখন বুঝতে পারবেন আমরা কী সিদ্ধান্ত নিলাম।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু মার্কেট এটি বুঝতে পারছে না অথবা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, অর্থাৎ মার্কেটে এটার জন্য একটা বড় নেতিবাচক প্রভাব এসেছে, সেহেতু অবশ্যই আমরা এটিকে রিভিউ (পর্যালোচনা) করব। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সেটি যখন কার্যকর হয়, তখন ‘হিতেবিপরীত’ হয়ে যেতে পারে। আমাদের কমিশন বাজারবান্ধব, তাই বিনিয়োগকারীদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। শুধু এটিই নয়, আরও যদি কোনো বিষয়ে যুক্তিযুক্ত আপত্তি আসে, সেগুলোও আমরা রিভিউ করব।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

