ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকেই দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর বিদেশিরা যত শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ কিনছেন, বিক্রি করছেন তার চেয়ে বেশি। নীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা, দুর্বল কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, ব্যাংক খাতের সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন ও বাজারে নেতিবাচক মনোভাব-সব মিলিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশিদের আগ্রহ কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার তুলে নিয়েছেন। এর আগের অর্থবছরে এই অর্থ তুলে নেওয়ার পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নীতিগত সিদ্ধান্তে বারবার পরিবর্তন এবং বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত করেছে। বিশেষ করে শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্য বা ফ্লোর প্রাইস দীর্ঘ সময় চালু থাকায় বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ফ্লোর প্রাইসের পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুদের হার নির্ধারণে সীমা আরোপও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ ছিল।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালে শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে প্রথমবার ফ্লোর প্রাইস চালু করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০২১ সালে ধাপে ধাপে তা তুলে নেওয়া হলেও ২০২২ সালে আবারও এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৬৯টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও অনেক কোম্পানি এ ব্যবস্থার আওতায় থেকে যায়। ২০২৩ সালে ওই ১৬৯ কোম্পানির ওপর আবারও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। ২০২৪ সালে ৩৫টি কোম্পানি ছাড়া অন্য সব কোম্পানি থেকে এ বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩৫টির মধ্যে ৩৩টি কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জুনে বাকি দুটি কোম্পানি থেকেও ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারে বেশ কিছু খারাপ নীতি ছিল, ফ্লোর প্রাইস তার মধ্যে একটি। ফ্লোর প্রাইসের কারণে আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইও বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত সূচক পর্যালোচনা স্থগিত করেছিল। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর চলতি বছরের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত সূচক পর্যালোচনা আবার শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে এমএসসিআই।
নীতির অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকের দুরবস্থায় আস্থা কমেছে: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি দেশে বিনিয়োগের আগে ওই দেশের সঙ্গে অন্য বাজারগুলোর তুলনা করেন। ফলে কোনো বাজারে নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি মনে হলে তারা সহজেই অন্য দেশে চলে যান।
এ বিষয়ে কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। নীতিগত সমস্যাগুলোও অনেকটা কেটে গেছে। তবে অতীতে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা ফিরতে সময় লাগবে। তার মতে, এক জায়গায় বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিনিয়োগকারী সহজে সেটি ভুলতে পারেন না।
বিদেশি বিনিয়োগ কমার পেছনে দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সাইফুল ইসলাম ও কাজী মনিরুল ইসলাম- দুজনই বিদেশি বিনিয়োগ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাংক খাতের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
তাদের মতে, আগে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারে সীমা নির্ধারিত ছিল। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও আর্থিক খাতের নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরে সুদের হার নির্ধারণের সীমা তুলে নেওয়া হলেও বর্তমানে অনেক ব্যাংক আর্থিক সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ব্যাংকের মুনাফা ও সম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভালো শেয়ারের সংকট: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমার আরেকটি বড় কারণ বাজারের তারল্য সংকট। আন্তর্জাতিক তহবিলগুলোর বিনিয়োগের উপযোগী বড়, ভালোভাবে পরিচালিত এবং নিয়মিত মুনাফা করে-এমন কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত। বড় তহবিলগুলো সাধারণত উচ্চ তারল্য, শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন ও ধারাবাহিক মুনাফার কোম্পানি খোঁজে। এর বাইরে টাকার অবমূল্যায়নও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি। স্থানীয় মুদ্রায় শেয়ারের দাম বা বিনিয়োগের মূল্য বাড়লেও টাকা ডলারে রূপান্তরের সময় সেই মুনাফা কমে যেতে পারে।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে।
কর ও অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রভাব: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে করব্যবস্থা ও বিনিয়োগের অর্থ দেশে আনা-নেওয়ার বিষয়ও প্রভাব ফেলে। মূলধনী মুনাফার ওপর কর, লেনদেন ব্যয় এবং বিনিয়োগের অর্থ সহজে দেশে ফেরত নেওয়া যাবে কি না-এসব বিষয় বিনিয়োগের প্রকৃত রিটার্ন কমিয়ে দিতে পারে। তবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নজরের বাইরে চলে যায়নি বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাইফুল ইসলাম বলেন, নিট বিদেশি বিনিয়োগ নেতিবাচক হলেও নতুন কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন, বিএসইসির পুনর্গঠন এবং নতুন নেতৃত্বের দ্রুত ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাজারে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে বিদেশি বিনিয়োগ ফেরাতে বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভালো ও বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, এখন বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং বিনিয়োগযোগ্য শেয়ার আনতে হবে। এগুলো ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসবেন না।
শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা: দেশের বড় শেয়াবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক্সচেঞ্জটিতে ৩৯৫টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণির কোম্পানি ১৯৫টি, ‘বি’ শ্রেণির ৭৪টি এবং ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানি ১২৬টি। অর্থাৎ বর্তমানে তালিকাভুক্ত অর্ধেকের বেশি কোম্পানি কম লভ্যাংশ দেয় অথবা একেবারেই দেয় না।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতি পরিবর্তন বা বিধিনিষেধ তুলে দিলেই বিদেশি বিনিয়োগ ফিরবে না। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করতে হলে কোম্পানির সুশাসন, আর্থিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত মুনাফা, পর্যাপ্ত তারল্য এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের মতে, বাজারের সব পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

