Logo

অর্থনীতি

বিনিয়োগে মন্দা, বাড়ছে অলস টাকা

Icon

এস রহমান খান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৫

বিনিয়োগে মন্দা, বাড়ছে অলস টাকা

ছবি: সংগৃহীত

রপ্তানিমুখী কারখানা এসএমএইচ নিউ জেনারেশন অ্যাপারেলস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ঢাকার অদূরে গাজীপুরে। হাজারো শ্রমিক কাজ করে রপ্তানিমুখী শিল্পটিতে। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ক্রেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছেন না কারখানার মালিক। তবে শ্রমিকের বেতন-ভাতা সঙ্গে কারখানা পরিচালনার নানা খরচ মেটাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মুহাম্মদ শাহীন রহমান শাহেদ, কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাংলাদেশের খবরকে এই উদ্যোক্তা জানালেন, ব্যবসা পরিচালনা করতে নিয়ে তিনি এখন রীতিমতো হতাশ। কারখানাটি দিন দিন রুগ্ন হয়ে পড়ছে। ব্যাংকের দায় মাথায়। আবার ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও মিলছে না। 

কেবল শাহীন রহমান নন, তার মতো হাজারো উদ্যোক্তা, শিল্প মালিক এখন বেকায়দায়। অবশ্য এই সংকট যে নতুন রাজনৈতিক সরকারের আমলে তৈরি হয়েছে, তা নয়। বিগত সরকারগুলোর পুঞ্জীভূত সংকট। এখন অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অনেক কারখানা রুগ্ন হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কমে গেছে। 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, সরকারের প্রচেষ্টা আছে, তবে আমরা খুব একটা সাফল্য দেখছি না। তা ছাড়া স্পষ্ট রোডম্যাপও নেই। উল্টো সরকার অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন করছে। এতে সাধারণ মানুষের কিছু যায়-আসে না। নীতি সুদহার কমানো হয়েছে, তবে পরিবেশ তৈরি না হলে বিনিয়োগকারীরা কেউ এগিয়ে আসবে না। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা। মে মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। 

একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগে গতি না থাকায় ব্যাংকগুলো বাড়তি অর্থ খাটাতে পারছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। এর সঙ্গে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর বাড়তি সতর্কতা যোগ হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে গেছে। আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট করছে। জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, নতুন শিল্প ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগে ঋণের চাহিদা খুবই কম। বর্তমানে যে ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বড় অংশই ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানির কাজে যাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা-ঋণও দেওয়া হচ্ছে। শিল্প-ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার সুযোগ কম।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সম্প্রতি নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বন্ধ কল-কারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো ৪১ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করবে। আর ৩৮ ব্যাংক ২৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা চেয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ছয় মাস হলো। এই ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিক স্বস্তির কারণ খুব বেশি নেই। তাই প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতি স্থিতিশীল হচ্ছে কি না, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, সরকার কি সমস্যাগুলোর প্রকৃতি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করছে?

সূত্রগুলো বলছে, রাজস্ব নীতিতে বাস্তবতার ঘাটতি স্পষ্ট। প্রায় প্রতি বছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, পরে তা অর্জিত হয় না। নতুন বাজেটেও বড় বৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, করের আওতা বাড়ানো এবং করছাড় কমানোর মতো সংস্কার সময়সাপেক্ষ। অবাস্তব লক্ষ্য দিয়ে ব্যয়ের কাঠামো দাঁড় করালে শেষ পর্যন্ত ঋণ বাড়ে অথবা উন্নয়ন ব্যয় কাটতে হয়। করভিত্তি অবশ্যই বাড়াতে হবে, তবে সহজে ধরা যায়, এমন ছোট ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ দিয়ে নয়। বড় কর ফাঁকি, অঘোষিত সম্পদ, উচ্চ আয়ের পেশাজীবী এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দরকার।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন জ¦ালানি সংকট প্রধান সমস্যা। অতি দ্রুত এর সমাধান করতে হবে। ব্যাংক খাত এলোমেলো অবস্থায় আছে। গত ছয় মাসে সরকার বেশ কিছু ভালো উদ্যোগও নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন। এখন এর বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অবকাঠামোসহ জ¦ালানি সমস্যার কারণে বেসরকারি খেতে দিনের চাহিদা কমে গেছে। তা ছাড়া ব্যাংকগুলো এখন বিতরণে সতর্ক। এর ফলে বেড়েছে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকা।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন