Logo

অর্থনীতি

চট্টগ্রাম বন্দর

এনসিটি পরিচালনায় দুবায়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৫০

অ
এনসিটি পরিচালনায় দুবায়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড

# ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি

# প্রথম ১০ বছরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ ১ হাজার কোটি টাকা

# সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

# চুক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি একটি কনসেশন চুক্তি হয়েছে তাদের। চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালটির আধুনিকায়নে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। এই উদ্যোগকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর এই চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থাকবে ‘ল্যান্ডলর্ড’ হিসেবে। অর্থাৎ এনসিটির জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড কেবল সেখানে চুক্তির মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সংযোজন করবে।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হামুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে। তবে টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত এসবের মালিক থাকবে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি সইয়ের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এককালীন অর্থ দিতে হবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করতে হবে।

এ ছাড়া নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তি সংযোজন ও পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এনসিটিকে আধুনিক করতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিকানা নয়, পরিচালনা: বিশ্বের অন্যতম বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম রয়েছে ৪০টির বেশি দেশে। বিশ্বের মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানেও রয়েছে তাদের কার্যক্রম। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশও পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতি কনটেইনারের জন্য এই অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এই ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে নামিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।

বিশ্বজুড়ে বন্দর পরিচালনায় এখন ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট’ মডেল জনপ্রিয় হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তিও এই কাঠামো অনুসরণেই হয়েছে। এনসিটির মালিকানার পাশাপাশি নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতেই থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পাবে। পরবর্তী মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি নির্ধারিত শর্ত পূরণ ও উভয় পক্ষের সম্মতির ওপর নির্ভর করবে।

নিশ্চিত আয়, রয়েছে জরিমানাও: টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে টিইইউপ্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪০-৬৭ শতাংশ রাজস্ব ভাগ বা রয়্যালটি পাবে। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার নির্ধারিত ফি এবং ন্যূনতম হ্যান্ডলিং নিশ্চয়তার শর্ত রয়েছে। চুক্তিতে বছরে অন্তত ১২ দশমিক ৩ লাখ টিইইউ ন্যূনতম হ্যান্ডলিংয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বন্দরে আরও নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলেও এর পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউর নিচে নামবে না বলে চুক্তিতে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

অপারেটরের কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করতে চুক্তিতে বিভিন্ন পারফরম্যান্স নির্দেশক (কেপিআই) ও আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বন্দরে ট্রাকের অবস্থানকাল ও ক্রেনের উৎপাদনশীলতাসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচকের পর্যায়ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। কোনো লক্ষ্যমাত্রা টানা তিন মাস অর্জিত না হলে আর্থিক জরিমানা প্রযোজ্য হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে কন্টেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং প্রতিবেদন, রাজস্ব তথ্য ও নিরীক্ষার মাধ্যমে টার্মিনালের কার্যক্রম তদারকি করবে।

২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এনসিটিতে বর্তমানে একটি কন্টেইনারের গড় অবস্থানকাল ৯ দিনের বেশি। প্রতিযোগী বন্দরগুলোতে এ সময় দুই দিনেরও কম। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের অবস্থানের সময় আড়াই দিনের বেশি, যেখানে প্রতিযোগী বন্দরগুলোয় তা ১৫-২৪ ঘণ্টা। এনসিটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তির লক্ষ্য শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া নয় বলে জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব বিনিয়োগে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও পরিচালন দক্ষতা যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে এনসিটিকে বিশ্বমানে উন্নীত করে বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে।

অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পদগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা দ্রুত বাড়ানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন পদ্ধতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার মাধ্যমে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করাই সরকারের বৃহত্তর নীতির অংশ।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশের এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, সরবরাহ অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ আরও নির্বিঘ্ন হবে।

ইসা কাজিম বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড তার পরিচালন দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য পরিবহন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সমন্বিত সক্ষমতা কাজে লাগাবে। এতে বাণিজ্য বাড়বে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই অংশীদারত্ব। চুক্তিটি এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা বাংলাদেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যদ্বারে আমরা আরও দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা এবং উচ্চতর মান নিশ্চিত করতে চাই।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি নির্দিষ্ট কনটেইনার পরিচালনা স্থাপনার একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এটি দেশের বাণিজ্য অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। তবে কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকার সময়, জাহাজের পণ্য ওঠানামা শেষ করে বন্দর ছাড়তে যে সময় লাগে এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বন্দরটি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটিতে একটি কনটেইনারের গড় অবস্থানের সময় নয় দিনের বেশি। অথচ সমপর্যায়ের কয়েকটি বন্দরে এ সময় দুই দিনেরও কম। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের অবস্থানকাল আড়াই দিনের বেশি, যেখানে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি বন্দরে তা ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মতো।

২০২৫ সালের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স সূচকে বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম।

সরকারের হিসাবে, বন্দরের পরিচালনগত অদক্ষতা ও পর্যাপ্ত আধুনিকায়নের অভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকার সময় এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।

এনসিটি পরিচালনার নতুন চুক্তিতে সেবার মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতা সূচক, ধাপে ধাপে অর্জনের লক্ষ্য এবং নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাকের যাতায়াতে সময় এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয়ও রয়েছে। কোনো নির্ধারিত কর্মদক্ষতার লক্ষ্য টানা তিন মাস পূরণ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক জরিমানা কার্যকর হবে।

টার্মিনালের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি, নিরীক্ষা এবং নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার ও জাহাজ পরিচালনা, আয় এবং অন্যান্য পরিচালন সূচক নিয়ে সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে রাখা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে টার্মিনালের মালিকানা বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব হস্তান্তর হবে না। নিরাপত্তা, শুল্ক, অভিবাসনসহ বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো যে দায়িত্ব পালন করছে, সেগুলো বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অধীনেই থাকবে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের পরিচয় ও পটভূমি যাচাইয়ের বিষয়ে সরকারি অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চুক্তির পরও স্থানীয় কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ফলে বন্দর ও পণ্য পরিবহন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকার-টু-সরকার নীতি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রাক-যোগ্যতা যাচাই, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, বিভিন্ন বিষয়ে যাচাই-বাছাই এবং আলোচনা হয়েছে।

২০২৩ সালের ২৩ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর লেনদেন কাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৫ জানুয়ারি দরপত্র জমা পড়ে। এরপর ২৭ জানুয়ারি থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত আলোচনা চলে। ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড এ ব্যবস্থা অনুমোদন করে। পরে ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিও অনুমোদন দেয়।

এ চুক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়নকাজের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হবে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস টার্মিনালটি নির্মাণ করছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টির বেশি সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয়। ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের।

চুক্তির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ: এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় বিক্ষোভ সমাবেশে লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিলে এই লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে।

এতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য সীমা দত্ত, সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, মনিরুজ্জামান মিলন, বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনীষা চক্রবর্তী, ছাত্র ইউনিয়নের আসিফ জামানসহ অনেকে আহত হন বলে জানা গেছে।

বিক্ষোভে উপস্থিত সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন গণমাধ্যমকে বলেন, 'এ চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করার শামিল। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্পৃক্ততা আছে। তাদের ওয়েবসাইটে গেলে বিষয়টি বোঝা যাবে।' জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের চুক্তি করা উচিত বলে জানান তিনি।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মারজিয়া প্রভা বলেন, 'শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দেশি অপারেটরদের পরিচালনায় লাভজনক অবস্থায় থাকার পরও বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আরো দ্রুতগতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ দেশের বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ তখন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের চাপে সরকার পিছিয়ে আসে। পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা বিএনপি সরকার সমস্ত বাঁধা-বিরোধ উপেক্ষা করে আজ এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।'

তিনি বলেন, 'সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর চাপের কাছে ইতোমধ্যেই সরকার নতি স্বীকার করেছে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা না করা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনা, ফ্রান্স থেকে এয়ারবাস কেনা, বন্দরের শ্রমিকদের দাবি ও দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির প্রশ্নকে অগ্রাহ্য করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর—মানুষের মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক করেছে যে, সাম্রাজ্যবাদী এসকল দেশের কাছে মুচলেকা দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে কিনা। ক্ষমতায় যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর স্বার্থ নগ্নভাবে রক্ষা করার এমন নজির আমরা ইতিপূর্বে দেখিনি।'

এদিকে, এই হামলার প্রতিবাদে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মুক্তি ভবনের সামন থেকে মশাল মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে বাম সংগঠনগুলো। শেরে বাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি চুক্তিকে কেন্দ্র করে বামপন্থী বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা আগারগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ করে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি।’


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন