রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলের ‘মহাবিদায়’
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১০
ছবি: সংগৃহীত
একটি যুগের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন ভারতীয় সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই সুরসম্রাজ্ঞীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্কে বিকালে তাকে শেষ বিদায় জানায় ভারত। কাকতালীয়ভাবে, এই শিবাজী পার্কেই তার বড় বোন লতা মঙ্গেশকরেরও শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল।
সোমবার সকাল থেকেই মুম্বাইয়ের লোয়ার পারেলে আশার নিজ বাসভবন ‘কাসা গ্র্যান্ডে’-তে তার মরদেহ রাখা হয়। প্রিয় শিল্পীকে শেষ নজর দেখতে সেখানে ভিড় করেন হাজারো অনুরাগী, সহকর্মী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস সকালে বাসভবনে উপস্থিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ ছাড়া শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকার, বলিউড তারকা টাবু, রিতেশ দেশমুখসহ বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের অসংখ্য বিশিষ্ট জন।
পারিবারিক সূত্রে জানানো হয়েছে, দুপুর ২টা পর্যন্ত মরদেহ তার বাসভবনে রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে শেষ যাত্রার শুরু হয়ে বিকাল ৪টায় শিবাজী পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
গায়িকার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে বলেন, বেলা ১১টা থেকেই ভক্তদের জন্য বাসভবনের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল যাতে সবাই তার শেষ দর্শন পেতে পারেন।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে বলিউড ও দক্ষিণি চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শাহরুখ খান, কাজল, শ্রেয়া ঘোষাল, কমল হাসান, রাম চরণ ও জুনিয়র এনটিআরসহ অসংখ্য তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন।
অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী আবেগঘন বার্তায় লিখেছেন, আমাদের অনেকের মতো আমিও আশাজির গান শুনে বড় হয়েছি। তার কণ্ঠ ছিল বিশুদ্ধ জাদু।
গত শনিবার অসুস্থ হয়ে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৯২ বছর বয়সী এই শিল্পী। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, বার্ধক্যজনিত কারণে শরীরের একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে (মাল্টি অর্গান ফেলিওর) রোববার তার মৃত্যু হয়। সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন তিনি। ২০টিরও বেশি ভাষায় তার কণ্ঠের বিচরণ ছিল ঈর্ষণীয়। গজল, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে আধুনিক পপÑ সবখানেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং সংগীতে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ১৯৯৭ সালে প্রথম ভারতীয় নারী শিল্পী হিসেবে গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়ে বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন তিনি। আশা ভোঁসলে চলে গেলেও তার অমর সৃষ্টি ও কণ্ঠের জাদুকরী প্রভাব বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অমলিন থাকবে চিরকাল।
কে হচ্ছেন ২৫০ কোটি রুপির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী?
আশার প্রয়াণে সুরের জগতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার পাশাপাশি এখন আলোচনায় উঠে এসেছে তার রেখে যাওয়া বিপুল আর্থিক সাম্রাজ্য। তিন সন্তানের মধ্যে দুই সন্তানকে আগেই হারানো এই শিল্পীর বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার কে হবেন, তা নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে জনমনে।
সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন আশা ভোঁসলে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী এই শিল্পীর আয়ের উৎস কেবল গান ছিল না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও আর্থিক বিশ্লেষণী সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৩৫ থেকে ৩৪০ কোটি টাকা)। এই বিপুল আয়ের বড় একটি অংশ আসে তার গানের রয়্যালটি থেকে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েক হাজার লাইভ কনসার্ট এবং ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকেও তার নিয়মিত মোটা অঙ্কের আয় হতো।
সংগীতের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বুদ্ধিতেও অনন্য ছিলেন আশা ভোঁসলে। মুম্বাইয়ের পেডার রোডের অভিজাত ‘প্রভু কুঞ্জ’ অ্যাপার্টমেন্টে তার মূল্যবান আবাস ছাড়াও মুম্বাই ও পুনেতে একাধিক বিলাসবহুল স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। তবে তার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল তার আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ চেইন আশা’জ। ২০০২ সালে দুবাইয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করা এই রেস্তোরাঁটি বর্তমানে কুয়েত, বাহরাইন এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের মতো শহরে ব্যাপক জনপ্রিয়। যেখানে ভারতীয় প্রিমিয়াম খাবারের স্বাদ নিতে ভিড় করেন ভোজনরসিকরা। আশা ভোঁসলের জীবনের সাফল্যের উজ্জ্বল আলোর নিচে ছিল গভীর ব্যক্তিগত শোক। ২০১২ সালে তার মেয়ে বর্ষা ভোঁসলে আত্মহত্যা করেন এবং ২০১৫ সালে বড় ছেলে হেমন্ত ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার স্বামী প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মনও বিদায় নিয়েছেন অনেক আগে।
পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, আশা ভোঁসলের এই বিশাল সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী হচ্ছেন তার একমাত্র জীবিত ছোট ছেলে আনন্দ ভোঁসলে। আনন্দ দীর্ঘদিন ধরেই মায়ের পেশাগত ও ব্যবসায়িক বিষয়গুলো দেখাশোনা করে আসছিলেন। এ ছাড়া আশার নাতি-নাতনিরা, বিশেষ করে নাতনি জানাই ভোঁসলেÑ যার সঙ্গে এই কিংবদন্তির অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক ছিল, তারাও এই সম্পত্তির অংশীদার হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই শিল্পী শুধু সম্পদই রেখে যাননি, রেখে গেছেন তার কালজয়ী কণ্ঠ। জানা যায়, অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে ও সমাজসেবায় ব্যয় করতেন। সুরের জাদুকরী মায়ার পাশাপাশি তার এই বিশাল সাম্রাজ্য ও সংগ্রামী জীবন আগামী প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

