জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠল ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের। দক্ষিণ ফ্রান্সের ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় অবস্থিত প্যালেস দে ফেস্টিভ্যাল ভবনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের তারকাদের উপস্থিতিতে শুরু হয়েছে এই ১২ দিনব্যাপী মহোৎসব। এ বছর কান উৎসবে এশীয় চলচ্চিত্রের বিশেষ আধিপত্য এবং রেড কার্পেটে আভিজাত্যের এক নতুন সমীকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এবারের উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জুরি বোর্ডের প্রধান হিসেবে দক্ষিণ কোরীয় কিংবদন্তি নির্মাতা পার্ক চ্যান-উকের নিয়োগ। কানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব জুরি সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ‘ওল্ড বয়’ এবং ‘ডিসিশন টু লিভ’-খ্যাত এই নির্মাতা উৎসবের শুরুতে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, এটি কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রে কোরীয় সিনেমার উত্থানের বড় স্বীকৃতি। তার সাথে বিচারক প্যানেলে আরও রয়েছেন অস্কারজয়ী নির্মাতা ক্লোয়ি ঝাও এবং হলিউড তারকা ডেমি মুর।
-6a048e24d32c5.jpg)
পিয়েরে সালভাদোরি পরিচালিত ফরাসি পিরিয়ড-কমেডি
‘দ্য ইলেকট্রিক
কিস’ প্রদর্শনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এবারের আসরে দুজনকে সম্মানসূচক
‘পাম দ’র’ প্রদান
করা হচ্ছে—নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত পরিচালক পিটার জ্যাকসন এবং আমেরিকান কিংবদন্তি অভিনেত্রী
ও গায়িকা বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড।
উদ্বোধনী দিনের রেড কার্পেটে সবচেয়ে বেশি
আলো কেড়েছেন বলিউড তারকা আলিয়া ভাট। কাস্টম মেইড পিচ রঙের গাউনের সাথে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয়
ওড়না (দোপাট্টা) জড়িয়ে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। বরাবরের মতোই
কান উৎসবের নিয়মিত মুখ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন তার রাজকীয় উপস্থিতি দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ
করেছেন। এছাড়া জেন ফন্ডা, ডেমি মুর এবং হেইডি ক্লামের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা তাদের
গ্ল্যামারাস পোশাক ও গয়না দিয়ে রেড কার্পেট মাতিয়ে রেখেছেন। এ বছর ভারত থেকে বিশাল
এক প্রতিনিধি দল কান উৎসবে অংশ নিচ্ছে। করণ জোহর, আশুতোষ গোয়াড়িকর এবং মালয়ালম নির্মাতা
চিদাম্বরম তাদের কাজ নিয়ে হাজির হয়েছেন। এমনকি মারাঠি ও গুজরাটি সিনেমার প্রতিনিধিরাও
এবার কানের বাণিজ্যিক শাখা ‘মার্শে দু ফিল্ম’-এ সরব উপস্থিতি দেখাচ্ছেন।
এবারের কানের অফিশিয়াল পোস্টারে ১৯৯১ সালের কালজয়ী সিনেমা ‘থেলমা অ্যান্ড লুইস’-এর দুই অভিনেত্রী জিনা ডেভিস এবং সুসান সারান্ডনকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। কান ক্লাসিকস বিভাগে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ২১টি মাস্টারপিস সিনেমা এবং মেক্সিকান মাস্টারপিস ‘প্যান’স ল্যাবিরিন্থ’-এর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রযুক্তি ও চলচ্চিত্রের মিলনে এবার ‘ইমারসিভ’ বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ক্যাটাগরিতে নয়টি কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। আগামী ২৩ মে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে পার্ক চ্যান-উকের নেতৃত্বাধীন জুরি বোর্ড ঘোষণা করবে এবারের সেরা সিনেমা অর্থাৎ ‘পাম দ’র’ বিজয়ীর নাম। চলচ্চিত্র প্রেমীদের নজর এখন ফরাসি এই সৈকতের দিকে—কার ভাগ্যে জুটবে বছরের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কার?
-6a048e32dc18e.jpg)
কানের রেড কার্পেটে অবিস্মরণীয় ৪১: বিশ্ব
চলচ্চিত্রের মহোৎসব ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’ মানেই কেবল রুপালি পর্দার লড়াই নয়, বরং এটি সমকালীন
ফ্যাশন এবং গ্ল্যামারেরও এক বিশাল প্রদর্শনী। ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবের রেড
কার্পেটে গত কয়েক দশকে এমন কিছু লুক দেখা গেছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
ফরাসি কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো থেকে শুরু করে আজকের এল ফ্যানিং—কান উৎসবের ইতিহাসের
সবচেয়ে প্রভাবশালী ৪১টি স্টাইল নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।
কান উৎসবের ফ্যাশন নিয়ে কথা হবে আর ২০১৮
সালে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্টের সেই মুহূর্তটির কথা আসবে না, তা অসম্ভব। সে বছর জুরি বোর্ডের
সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্টুয়ার্ট। কানের কঠোর ড্রেস কোড অনুযায়ী নারীদের জন্য
‘হিল’ পরা বাধ্যতামূলক
ছিল। কিন্তু স্টুয়ার্ট রেড কার্পেটে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তার জুতো খুলে ফেলেন এবং
খালি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন। এটি ছিল কানের দীর্ঘদিনের ‘ফ্ল্যাট শু ব্যান’-এর বিরুদ্ধে এক নীরব
কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ।
কানের রেড কার্পেট বারবার কেঁপেছে আইকনিক সব জুটির উপস্থিতিতে। তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, রিহানা এবং আসাপ রকির স্টাইল স্টেটমেন্ট সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তিমোথি শালামে এবং টিল্ডা সুইন্টনের ২০২১ সালে ‘কোঅর্ডিনেটেড’ স্টাইলিশ উপস্থিতি ছিল এক কথায় অনবদ্য এবং গত বছরের কান উৎসবে ‘অ্যানাটমি অফ আ ফল’ সিনেমার তারকা কুকুরটিও কিন্তু ব্ল্যাক টাই লুকে রেড কার্পেটে নেটিজেনদের মন জয় করেছিল।
-6a048e43da1ca.jpg)
১৯৫৩ সালে ব্রিজিত বার্দোর সেই বিকিনি
পরিহিত লুক কানে ফ্যাশনের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল। তেমনি আজকের যুগে এল ফ্যানিং তার প্রতিটি
পোশাকে যেন ‘ওল্ড হলিউড গ্ল্যামার’
ফিরিয়ে আনেন। বিশেষ করে ২০১৯ সালে তার সেই বিশাল আকৃতির হ্যাট এবং প্রাদা গাউনটি কানের
ইতিহাসের অন্যতম সেরা লুক হিসেবে বিবেচিত হয়। তালিকায় আরও রয়েছে লেডি ডায়ানার ১৯৮৭
সালের সেই নীল শিফন গাউন, ম্যাডোনার ১৯৯১ সালের সেই অন্তর্বাস স্টাইল গাউন এবং ঐশ্বরিয়া
রাই বচ্চনের নজরকাড়া সব ভারতীয় ও ওয়েস্টার্ন ফিউশন পোশাক।
কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে
এই ৪১টি লুক আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, সিনেমা যেখানে শিল্প, ফ্যাশন সেখানে সেই শিল্পেরই
এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

