মাতৃত্বের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক চাপে পড়ে ভুয়া গর্ভাবস্থার নাটক সাজানো এবং পরবর্তীতে মেক্সিকো সিটির একটি হাসপাতাল থেকে এক নবজাতক শিশুকে অপহরণের চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নেটফ্লিক্সের নতুন ডকুড্রামা ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’ ।
দুইবার অস্কার মনোনীত চিলির খ্যাতনামা
পরিচালক মাইতে আলবের্দির পরিচালিত এই তথ্যচিত্রে ২০০৯ সালে ঘটে যাওয়া এলেওনোর আলেহান্দ্রে
মারিন মেনদোজা (যিনি ‘আলে’ নামে পরিচিত) নামক এক তরুণীর এই অবিশ্বাস্য ও ট্র্যাজিক জীবনের
নানা অজানা দিক উন্মোচিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৯ সালের ১৭ জুন, যখন
২৬ বছর বয়সী আলেহান্দ্রে মেনদোজা মেক্সিকো সিটির একটি হাসপাতাল থেকে গিফট ব্যাগে করে
এক নবজাতক কন্যাশিশুকে চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যান। চুরির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি হোটেল
থেকে তিনি ও তার স্বামী বার্তুরো গ্রেপ্তার হন এবং শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় তার আসল
মা মায়রা নাভারো ভেগার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য—স্বামীর
ভালোবাসা ধরে রাখতে এবং শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে কৃত্রিমভাবে
গর্ভবতী হওয়ার ভান করেছিলেন আলে। টানা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে নিজের ওজন ৫৪ কেজি থেকে
বাড়িয়ে ৮৯ কেজিতে নিয়ে যাওয়া এবং কর্মস্থলের সুবাদে নিজের মেডিকেল রেকর্ড জালিয়াতি
করে স্বামী, পরিবার এমনকি ডাক্তারদেরও বোকা বানিয়েছিলেন তিনি। শিশু অপহরণের দায়ে আদালত
তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
দুই পর্বে বিভক্ত এই ব্যতিক্রমী ডকুড্রামায়
তুলে ধরা হয়েছে মেক্সিকোসহ পুরো লাতিন আমেরিকান সমাজে একজন নারীর ওপর 'সন্তান জন্মদানের'
কতটা ভয়াবহ ও অমানবিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। তিনবার গর্ভপাতের শিকার হওয়া আলেকজান্ড্রাকে
তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন সন্তান দিতে না পারা অকার্যকর নারী বলে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন
চালাতো। ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী ডক্টর নরমা রোমেরো সানচেজ জানান, কোনো উপযুক্ত মানসিক
স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় নিজের বেদনাদায়ক বাস্তবতাকে ঢাকা দিতে আলে এক জটিল মানসিক
বিভ্রান্তি ও ফ্যান্টাসির জগতে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এই
শিশু অপহরণ।
কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালে মুক্তি
পাওয়া আলে নিজেও এই তথ্যচিত্রে ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে নিজের অনুসূচনা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, আমার মা হওয়ার ইচ্ছাটা আসলে অন্যকে সন্তুষ্ট করার চরম সামাজিক চাপের ফলেই
তৈরি হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম মা হওয়া ছাড়া জীবনের আর কোনো অর্থ নেই। কিন্তু দীর্ঘ এই
জেলজীবনের পর আমি বুঝতে পেরেছি, বেঁচে থাকার জন্য মাতৃত্বের বাইরেও অনেক পথ খোলা আছে।
অপরাধের শাস্তি হলেও, একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য সমাজের চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতিকে
এবার বিশ্বমঞ্চে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে নেটফ্লিক্সের এই তথ্যচিত্র।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

