ছবি: সংগৃহীত
মানুষ কেন কাঁদে— এই প্রশ্নের উত্তর উনিশ শতকের ইংরেজ জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের কাছে ছিল এক উদ্দেশ্যহীন ধাঁধা। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কান্না কেবল দুঃখের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে অন্যের আচরণ বদলানো যায়।
বিজ্ঞানীরা বলেন, কান্না মানুষের বিবর্তনের এক অদ্ভুত ‘সামাজিক প্রযুক্তি’, যা মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
১৮৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য এক্সপ্রেশন অফ দ্য ইমোশনস ইন ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যালস’ বইতে চার্লস ডারউইন মানুষের আবেগের এই প্রকাশকে ‘উদ্দেশ্যহীন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি কান্নাকে ‘এপিফেনোমেনন’ বা নিছক জৈবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন। আচরণের প্রায় সব কিছুতেই অর্থ খুঁজে পাওয়া এই বিজ্ঞানীর কাছে কান্না ছিল ব্যতিক্রম।
দেড়শ বছর পর সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পরিষ্কার। আর সেটি ডারউইনের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল বলে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছে ফোর্বস ম্যাগাজিন।
বিবর্তনের দৃষ্টিতে কান্না প্রথম দেখায় অযৌক্তিক মনে হয়। এটি দৃষ্টি ঝাপসা করে, দুর্বলতার সংকেত দেয়, এবং সরাসরি কোনো কাজেও লাগে না।
তারপরও কান্না সার্বজনীন। ইতিহাসের প্রতিটি নথিবদ্ধ মানব সংস্কৃতিতেই কান্নার উপস্থিতি রয়েছে। লাখ লাখ বছর ধরে এবং নানা সামাজিক পরিবেশে কান্নার টিকে থাকা কাকতালীয় নয়।
২০১৮ সালে ‘হিউম্যান নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কান্না আসলে একটি বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এটি শব্দ, দৃশ্য ও রাসায়নিক সংকেত— সব মিলিয়ে কাজ করে।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের চোখের পানি শুধু আবেগ প্রকাশের জন্য নয়, বরং আশপাশের মানুষের আচরণ প্রভাবিত করার জন্যও বিবর্তিত হয়েছে।
কান্নার ইতিহাস শোক দিয়ে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল ক্ষুধা, ঠান্ডা বা ভয় থেকে। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, শুরু হয়েছিল শিশুর মাধ্যমে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শাবক বিচ্ছিন্ন হলে তারা এক ধরনের যন্ত্রণার শব্দ করে। এই শব্দের মূল উদ্দেশ্য হলো সন্তান ও যত্নকারীর দূরত্ব কমানো।
২০১৮ সালের এক পর্যালোচনায় দেখানো হয়েছে, মানুষের শিশুর কান্না এই একই ধাঁচ থেকে এসেছে। এটি এমন একটি শব্দসংকেত, যার স্বর ও তীব্রতা প্রয়োজন অনুযায়ী বদলায় এবং জরুরি অবস্থার নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত দেয়।
এই সংকেত কার্যকর কারণ শিশু ও পরিচর্যাকারী— দুজনেরই স্বার্থ এর নির্ভুলতার ওপর নির্ভর করে। ভুয়া সংকেত উপেক্ষিত হয়, আর সত্যিকারের সংকেতেরই সাড়া মেলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকেত বড়দের জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় চোখের পানি, ঠোঁট কাঁপা, ভেঙে পড়ার মতো দৃশ্যমান লক্ষণ। ফলে এটি আরো জটিল এক যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কাঁদলে আশপাশের মানুষ তার প্রতি বেশি সহমর্মী হয়ে ওঠে। তাদের আক্রমণাত্মক মনোভাব কমে যায়। এতে সামাজিক বন্ধন আরো শক্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কান্না এমন এক সংকেত যা সহজে নকল করা যায় না। এতে এক ধরনের বার্তা থাকে, আমি কোনো হুমকি নই, আমার সাহায্য দরকার এবং আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।
আরো এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেউ অন্যকে কাঁদতে দেখলে দুজনের মস্তিষ্কের একই অংশ সক্রিয় হয়। সহমর্মিতার সঙ্গে জড়িত ‘মিরর নিউরন নেটওয়ার্ক’ চোখের পানিতে সাড়া দেয়।
বিবর্তনের পথে চোখের পানি এমন এক সংকেতে পরিণত হয়েছে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহানুভূতি জাগায়। পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল প্রজাতির জন্য এটি বড় সুবিধা। তবে এর আরেকটি দিকও আছে। কান্না নতি স্বীকারের সংকেত দেয়। এটি এমন বার্তা দেয় যে, কান্নারত ব্যক্তি আর আক্রমণাত্মক নয়।
দ্বন্দ্বের পরিস্থিতিতে কান্না অনেক সময় এমনভাবে উত্তেজনা কমায়, যা শুধু কথায় সম্ভব হয় না। বিবর্তনের দৃষ্টিতে এটি খুবই যৌক্তিক। উভয় পক্ষ যদি সংকেতটি বুঝতে পারে, তবে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব।
বিজ্ঞান এখানে আরও চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে। ২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, আবেগজনিত চোখের পানিতে গন্ধহীন রাসায়নিক সংকেত থাকে। মানুষ এগুলো সচেতনভাবে টের না পেলেও শরীর সাড়া দেয়।
২০২৩ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ অংশগ্রহণকারীরা অজান্তেই এমন চোখের পানির সংস্পর্শে এলে তাদের আক্রমণাত্মক আচরণ প্রায় ৪৩ দশমিক সাত শতাংশ কমে যায়। মস্তিষ্কের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো দমন হয়।
আবেগপ্রবণ চোখের পানি সাধারণ চোখের পানির মতো নয়। এতে ‘প্রোল্যাক্টিন’, ‘অ্যাড্রেনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন’, ‘লিউ-এনকেফালিন’, পটাশিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা বেশি থাকে।
অর্থাৎ চোখের পানি শরীরের ভেতরের আবেগীয় অবস্থার একটি ‘সৎ সংকেত’ বহন করে। তবে এই গবেষণা এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। কিছু ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আছে। তবুও সামগ্রিকভাবে ছবিটি পরিষ্কার হচ্ছে।
চোখের পানি এত কার্যকর হলে মানুষ তা চেপে রাখে কেন? এর কারণ সামাজিক রীতি। অনেক পেশাগত পরিবেশে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। তবে বিজ্ঞান বলছে, কান্না একটি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন— এমন প্রমাণ রয়েছে। এর পেছনে হরমোন ও সামাজিক প্রভাব কাজ করে। তবে কান্নার জৈবিক সক্ষমতা সবার ক্ষেত্রেই একই। পার্থক্য শুধু এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতায়।
মানুষ কেবল বাস্তব কারণে নয়, শিল্পের কারণেও কাঁদে। সিনেমা, গান বা উপন্যাসেও চোখ ভিজে ওঠে। অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে এমন আচরণ দেখা যায় না।
গবেষণা বলছে, বাস্তব জীবনের যন্ত্রণার সংকেত দেওয়ার জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা শিল্পের ক্ষেত্রেও সক্রিয় হয়। অর্থাৎ, শিল্প সেই একই আবেগের ভাষায় কথা বলে, যা বিবর্তন আমাদের মধ্যে তৈরি করেছে।
কান্না একাধিক কাজে লাগে বলেই এটি টিকে আছে। এটি যন্ত্রণার শব্দ, সহমর্মিতার দৃশ্যমান সংকেত, আগ্রাসন কমানোর উপায়, সামাজিক বন্ধন গড়ার মাধ্যম এবং রাসায়নিক বার্তা— সব একসঙ্গে।
যে কোনো কার্যকর আচরণের মতোই কান্নাও সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন ভূমিকা নিয়েছে। প্রতিটি নতুন ব্যবহারই একে টিকে থাকার আরও কারণ দিয়েছে।
বিবর্তন সাধারণত এভাবেই কাজ করে। এটি নতুন করে কিছু তৈরি করে না, বরং পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন কাজ যোগ করে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

