রেডিওথেরাপি নিয়ে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক তথ্য
স্বাস্থ্য ডেস্ক :
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১৮:৩৯
সংগৃহীত
ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি বর্তমানে অত্যন্ত কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে, আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রোগ নিরাময়ের পথও তৈরি করে। পাশাপাশি ব্যথা, রক্তক্ষরণ কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো জটিল উপসর্গ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই চিকিৎসা।
তবে বাংলাদেশে এখনো রেডিওথেরাপি নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ভয়, ভুল ধারণা ও কুসংস্কার রয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নিতে দেরি করেন কিংবা অযথা আতঙ্কে ভোগেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেডিওথেরাপির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও অধিকাংশই সাময়িক, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সহনীয় পর্যায়ে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে আগের তুলনায় এখন রেডিওথেরাপি অনেক বেশি নিরাপদ ও নির্ভুল হয়েছে।
যেসব ভয় সবচেয়ে বেশি
রোগীদের মধ্যে সাধারণত কয়েকটি ভয় বেশি কাজ করে। যেমন—শরীর পুড়ে যাবে, সব চুল পড়ে যাবে, রোগী একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বেন কিংবা রেডিওথেরাপি মানেই জীবনের শেষ পর্যায়। অনেকেই মনে করেন, এই চিকিৎসা অত্যন্ত কষ্টকর।
চিকিৎসকদের মতে, এসব ধারণার বেশিরভাগই অতিরঞ্জিত কিংবা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাস্তবে সব রোগীর একই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। এটি নির্ভর করে শরীরের কোন অংশে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে, কত ডোজ দেওয়া হচ্ছে এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর।
কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে
রেডিওথেরাপির সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ক্লান্তি। চিকিৎসার মাঝামাঝি বা শেষে অনেক রোগী দুর্বলতা বা অতিরিক্ত বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করেন।
এ ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া স্থানে ত্বক লালচে বা কালচে হয়ে যাওয়া, শুষ্কতা, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। মাথা ও ঘাড়ে রেডিওথেরাপি হলে গিলতে কষ্ট, মুখে ঘা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া কিংবা স্বাদের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
পেট বা তলপেটের অংশে চিকিৎসা হলে বমিভাব বা পাতলা পায়খানার সমস্যাও হতে পারে। আর মাথায় রেডিওথেরাপি দেওয়া হলে সাধারণত শুধু সেই অংশের চুল পড়ে, পুরো শরীরের চুল নয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই চিকিৎসা চলাকালীন বা কিছুদিন পরে দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কমে যায়।
কুসংস্কার ও ভুল ধারণা
সমাজে এখনো অনেকেই মনে করেন, রেডিওথেরাপি নেওয়া রোগীর সঙ্গে থাকা বা খাওয়াদাওয়া করা নিরাপদ নয়। কেউ কেউ ধারণা করেন, চিকিৎসার পর পুরো শরীর ‘রেডিয়েশন’ হয়ে যায়। আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেই অনেকে ভাবেন চিকিৎসা ভুল হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের অভাব, অন্যের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার গল্প এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানোর উপায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু নিয়ম মেনে চললে রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এ জন্য চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর ও নরম খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ধূমপান বা তামাক সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা জরুরি। চিকিৎসা দেওয়া স্থানে ঘষাঘষি বা গরম সেঁক না দেওয়ারও পরামর্শ দেন তারা।
এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ক্রিম, তেল বা হারবাল উপাদান ব্যবহার না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। মুখে রেডিওথেরাপি হলে মুখ ও দাঁতের বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
যদি উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, গিলতে না পারা, বারবার বমি, তীব্র ডায়রিয়া, অসহনীয় ব্যথা, গুরুতর ত্বকের ক্ষত বা রক্তপাত দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
সচেতনতাই হতে পারে ভরসা
চিকিৎসকদের মতে, রেডিওথেরাপি নিয়ে অযথা ভয় না পেয়ে সঠিক তথ্য জানা জরুরি। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সাময়িক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই গুজব বা কুসংস্কারের পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর আস্থা রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

