Logo

স্বাস্থ্য

হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি, ডেঙ্গু বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:২২

হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি, ডেঙ্গু বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

ছবি: সংগৃহীত

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে না আসতেই দ্রুতগতিতে ডেঙ্গুর বিস্তার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম ও এর উপসর্গে ৯৭৩ জনের মৃত্যু এবং প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার রোগী নথিভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এক মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। 

বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, শিশু বা ব্যক্তি একই সঙ্গে দুটি রোগে আক্রান্ত হলে বা হাম থেকে ওঠার পর ডেঙ্গুতে পড়লে মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। দেশের প্রধান হাসপাতালগুলোতে তীব্র শয্যাসংকটে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। 

একদিকে শতভাগের বেশি কাভারেজ দাবি করেও ‘হার্ড ইমিউনিটি’ না হওয়া এবং ৬-৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকার নীতিগত সিদ্ধান্ত না থাকায় হাম পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘প্রাকৃতিক উপায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া’ বলে অভিহিত করছেন। 

অন্যদিকে মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের শত কোটি টাকারও বেশি বিশাল বাজেট ও বিভিন্ন কার্যক্রম সত্ত্বেও সমন্বিত উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও জনসম্পৃক্ততার অভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণ দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে উদ্বেগ জাগানো হাম নিয়ন্ত্রণে টিকা ক্যাম্পেইনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এ রোগ নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের দাবি, হামের যে পরিস্থিতি, তাতে এটি প্রাকৃতিক উপায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

ফলে হামে আক্রান্ত কিংবা হাম থেকে মাত্র সেরে ওঠা শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তারা বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে মৃত্যু ঝুঁকিও বাড়ছে। রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ দেখছেন না তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাম ও এর লক্ষণ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য রাখছে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে। ওই সময় থেকে সোমবার পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মোট প্রাণ গেছে ৯৭৩ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৯ জন।

আর এখন পর্যন্ত এক লাখ ৫৭ হাজার ৯৯১ জনের হামের উপসর্গ থাকা রোগীর তথ্য নথিভুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর নিশ্চিত করে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৩১২ জন।

অপরদিকে সোমবারের বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৮৪৬ জনে। মারা গেছেন মোট ৯৭ জন।

এর মধ্যে আগস্টের ৩০ দিনের হিসাবে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, এর আগে জুলাইয়ে মোট ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। জুলাইয়ের আগে জুনে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭, তার আগে মে মাসে ৭১৪, এপ্রিলে ৬৪০ আর মার্চে ৩৫৩ জন।

বৃষ্টিপাতের মৌসুমে অর্থাৎ জুলাই মাস থেকেই ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে, যা নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন তারা।

হাম ও ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাচ্ছে হাসপাতালগুলো। অনেক হাসপাতালে বেড খালি নেই, ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও বিছানা পেতেছেন রোগী ও স্বজনরা।

‘শয্যার অভাবে ভর্তি নিতে পারছি না’: বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৫ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।

৩০ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ৯৯ জন ও ডেঙ্গু নিয়ে ৩৭ জন ভর্তি রয়েছেন।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে বেডে ভর্তি রয়েছেন ২৩৬ জন, যা সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। আর হাম নিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি রয়েছেন ৮৩ জন।

নাম প্রকাশ না করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, আমরা শয্যার অভাবে রোগী ভর্তি নিতে পারছি না। মূলত ডেঙ্গু বা হামে রোগীদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় ভর্তি করা হয়। খুব খারাপ হলেই তাদের ভর্তি নিচ্ছি। এছাড়া বেডও ফাঁকা নাই। বর্তমানে বছরের সবচেয়ে বেশি হারে ডেঙ্গুর টেস্ট হচ্ছে।

হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীদের প্রচুর চাপ। আমরা যথাসম্ভব চিকিৎসা এবং ভর্তি নেওয়ার চেষ্টা করছি। ডেঙ্গুর রোগীদের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসলে আর ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট সঠিক করা গেলে অবস্থা ভালো হয়। বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় না, সেটাই আমরা করছি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমরা চার থেকে পাঁচজন রোগী পেয়েছি, যাদের শরীরে হাম ও ডেঙ্গু পজেটিভ দেখা দিয়েছিল। এতে তাদের শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ হয়। কিন্তু সর্বোচ্চ চিকিৎসায় তারা সুস্থ হয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক।

হামের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন।

তার কথায়, কারও হাম হওয়ার পর ডেঙ্গু হলে স্বাভাবিকভাবে অন্যদের তুলনায় শারীরিকভাবে বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে।

মৃত্যুঝুঁকি ও হাসপাতালে রোগীর ভিড় কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়ে মুশতাক হোসেন বলেন, তাতে শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা যাবে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুসারে চিকিৎসক পরামর্শ দেবেন। প্রয়োজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীরা যেন সঠিক চিকিৎসা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব না করা গেলে শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে প্রচুর ভিড় হবে। এতে চিকিৎসা সেবা যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়াবে।

হাম ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ: হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় সমালোচনার মধ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল শুরু হয় চার সিটি করপোরেশন এলাকায়।

২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সি শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার, যা শেষ হয় ২০ মে। টিকাদানের ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি এবং হাম নিয়ন্ত্রণে আসার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। তাই পরিস্থিতি অনুসারে এটি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ বা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন তেমন হচ্ছে না বলে মতামত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুসারে, এ বছর ১ কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে। যদিও ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন। সেই অনুসারে টিকার কাভারেজ ১০৯ শতাংশ।

ক্যাম্পেইনে দেশের শতভাগের বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে বলে সরকার যে দাবি করে আসছিল, তাতে আগে থেকেই দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে হামের টিকার মতই ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেখানে শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪০ লাখ। সেসময় পর্যন্ত দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় প্রায় ৫৫ লাখের ফারাক ছিল।

তবে গত ১৬ আগস্ট টিকাবিষয়ক আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটিতে (আইসিসি) দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাদ পড়া ১৬ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

অপরদিকে চলতি বছরের শুরু থেকে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণীর করার পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। তারা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ডেঙ্গু রোগী বাড়ত না।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের যে পরিস্থিতি তাতে এটি প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবার হাম হবে এবং কিছু অংশ মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

তিনি বলেন, দেশের হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে একটা গ্রুপের বয়স ছয় থেকে নয় মাসের কম এবং দুই বছরের বেশিও আছে। তাদের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি যে কী করা হবে। ফলে হাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য গভীর স্টাডি হওয়া দরকার। সেটির কিছুই হচ্ছে না। তাহলে কীভাবে হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।

হাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তার কথায়, হাম নিয়ে সেভাবে আর কথা হচ্ছে না। আর ডেঙ্গু বাড়বে এটির সতর্কতা অনেক আগে থেকেই বলা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই পরিস্থিতি জটিলের দিকে যাচ্ছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেছেন, ডেঙ্গু মশার নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘হোম টু হোম’ সম্পৃক্ততা প্রয়োজন, যেটি হয়নি। কারণ মশার বিস্তার রাস্তাঘাটের চেয়ে বাসাবাড়ির বিভিন্ন স্থানে বেশি হয়। ফলে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, মানুষদের সচেতন করে জনসম্পৃক্ততায় মশায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

আর হাম নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে উঠতে হয়। যেটা এখনো হয়নি। আমাদের টিকা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একটা কমিউনিটির অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষ চলমান রোগের টিকা পেলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে উঠে। সেটা আশা করি দ্রুত হবে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

হামে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক মৃত্যু নিয়ে তিনি বলেন, এসব রোগী আসলে হামে নাকি ‘পিউর নিউমোনিয়ায়’ মারা যাচ্ছে, সেটির বিষয়ে আমার গভীর অনুসন্ধান করছি। আর সন্দেহজনক হাম এই তালিকা বা ঘর আমরা উঠিয়ে দিতে চাই। কিন্তু শুরু থেকে এটি প্রকাশ করায় সেটিও করা যাচ্ছে না।

দুই সিটির বাজেট ৩২২ কোটি, তবুও ডেঙ্গু বাড়ছে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩১ অগাস্টের ডেঙ্গু বুলেটিনে ১ হাজার ১৬৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে এ পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ১৮২ জন। ১২৩ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে।

ডিএনসিসির মশা নিয়ন্ত্রণ বাজেট ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৯ দশমিক ৩০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১৮৭ দশমিক ৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

ডিএসসিসি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ৩০ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৫৭ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা ধরা হয়।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি ২০৮ কোটি টাকা এবং ডিএসসিসি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

এর আগে ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন মিলে ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করে। এর মধ্যে ডিএনসিসি ব্যয় করে ৪০৯ কোটি এবং ডিএসসিসি ১৯৬ কোটি টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, এবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে ‘সোর্স রিডাকশনের’ ওপর। বৃষ্টির পানি জমে যেখানে মশার লার্ভা তৈরি হয়, সেই উৎসগুলো কমানোর ওপরই মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক রোগীর পাশে আমার লোক আছে। উত্তর সিটিতে যেসব হাসপাতালে আমাদের রোগী বেশি ভর্তি হয়, এমন ১০টি হাসপাতাল আমরা ঠিক করেছি। ওই ১০টি হাসপাতালে আমাদের কর্মীরা থাকে। প্রতিদিন তাদের কাছ থেকে রোগীর সঠিক ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়। রোগী কোথায় থাকেন, কোথায় কাজ করেন, এসব তথ্যও নেওয়া হয়। আমরা তাদের ডেটা সংগ্রহের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমি তাদের জন্য দুই পৃষ্ঠার একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করে দিয়েছি। প্রতিদিন উত্তর সিটির হাসপাতালগুলোতে থাকা রোগীদের সব তথ্য আমার কাছে আসে। তাদের বাড়ি কোথায়, সেটিও থাকে। এরপর সন্ধ্যায় সব জোন থেকে তথ্য আসার পর তা কম্পাইল করে আবার সংশ্লিষ্ট টিমের কাছে পাঠাই। এরপর কিউআরটি টিম সেদিন রাতেই অথবা পরদিন সকালে, যেখানেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেখানে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এ ধরনের ‘অ্যাকটিভ কেস সার্ভিলেন্স’ আর কোথাও হয়নি।

ডিএনসিসির কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, এগুলো অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কার্যক্রম থেকে আলাদা। অন্যদের কার্যক্রম অনেকটা কমন- সকালে লার্ভিসাইড দেওয়া, এরপর ধোঁয়া দেওয়া। তবে ধোঁয়া দেওয়ার বিষয় থেকেও আমরা কিছুটা সরে আসছি। কারণ এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের কিছু বিষয় আছে। ধোঁয়াকে এখন আর খুব বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমগুলো চলমান আছে। আর যে ২৭টি অঞ্চলকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, মে মাসে জরিপ করার পর সেই রিপোর্ট প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সবার সামনে প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর ওই ২৭টি অঞ্চলে আমরা পুরো এক মাস ধরে ক্রাশ প্রোগ্রাম করেছি। একটি অঞ্চল অলটারনেট করে করে এক মাস ধরে এই ক্রাশ প্রোগ্রাম চালিয়েছি। আমরা হাসপাতালে হাসপাতালে আমাদের কিছু প্রকল্প থেকে পাওয়া জনবল দিয়েছি। তাদের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতালগুলোতে গিয়ে খবর নিচ্ছেন, রোগীরা আসলে ঢাকা নাকি ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন।

এ কর্মকর্তা বলেন, যদি দেখা যায়, কোনো রোগী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোনো এলাকা থেকে এসেছে, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী সেখানে ক্রাশ প্রোগ্রাম করছি। ধরেন, নন্দীপাড়া থেকে একজন রোগী পাওয়া গেল, তাহলে নন্দীপাড়ায় আমরা তিন-চার দিন ক্রাশ প্রোগ্রাম করি। সেই ক্রাশ প্রোগ্রামে জনপ্রতিনিধিদেরও যুক্ত করছি। ওই এলাকার বিএনপির কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, অনেক সময় সাবেক কাউন্সিলররাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন এবং আমাদের সঙ্গে এই কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওষুধ প্রয়োগ নিয়ে তিনি বলেন, আমরা সকালে টেমিফস দিচ্ছি। টেমিফস খুবই কার্যকর একটি ওষুধ। সকালে যে লার্ভাকে দেওয়া হয়, লার্ভিসাইড হিসেবে এটি লার্ভাগুলো মেরে ফেলে। ফলে মশা আর বড় হতে পারে না।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন