Logo

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ নিয়ে এবার ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্ব

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ২১:৩১

ইরান যুদ্ধ নিয়ে এবার ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্ব

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার গতকাল বুধবার ছিল ৩৩তম দিন। হামলার প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করেছে ইরান। দেশটি ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাত ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে আসা পৃথক বিবৃতিতে এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে। 

ইরান নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্ব: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তেহরানের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন তাদের সামরিক অভিযান শেষ করতে পারে। 

অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে দমনের এই অভিযান এখনই শেষ হচ্ছে না। ইহুদিদের পাসওভার উৎসবের প্রাক্কালে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে’ ইসরায়েল তার সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে। দুই মিত্র দেশের শীর্ষ নেতার এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইরানে ১ লাখ ১৫ হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। আজ বুধবার ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হালনাগাদে এ তথ্য জানিয়েছে।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর মধ্যে আবাসিক ভবন, চিকিৎসা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ত্রাণ কেন্দ্রসহ নানা ধরনের বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। এই স্থাপনাগুলোর ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ তেহরান প্রদেশে অবস্থিত। ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধবিরতি চেয়েছে, দাবি ট্রাম্পের: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের 'নতুন সরকারের প্রেসিডেন্ট' যুদ্ধবিরতি চাইছেন। ট্রাম্প তাকে পূর্বসূরিদের তুলনায় 'অনেক কম কট্টরপন্থি' এবং 'অনেক বেশি বুদ্ধিমান' বলে অভিহিত করেছেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার আগে ট্রুথ সোশ্যাল-এ একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, 'ইরানের নতুন সরকারপ্রধান তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক কম কট্টরপন্থি এবং অনেক বেশি বুদ্ধিমান। তিনি এইমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন!'

তিন সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ করবে যুক্তরাষ্ট্র: ইরানে চলমান সামরিক অভিযান আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই সময়সীমার কথা জানান।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানে আমাদের আক্রমণাত্মক কার্যক্রম গুটিয়ে আনছি। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান শেষ হবে বলে আমি আশা করছি।’

মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছানোয় তারা এখন এই যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবছে। তবে এই সময়ের মধ্যে ইরান কোনো পাল্টা পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানকে কোনো চুক্তিতে আসতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে কোনো সমঝোতা ছাড়াই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে।’

ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তাদের কাছে এখন কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই।’

ট্রাম্প তার বক্তব্যে আরও দাবি করেন, ইরানি শাসনে পরিবর্তন আনার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। তবে বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় ইতিমধ্যে পরিবর্তন ঘটে গেছে।

শত্রুদের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে: ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি 'এই জাতির শত্রুদের' জন্য বন্ধ রাখা হবে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, কৌশলগত এই জলপথটি বর্তমানে তাদের নৌ-বাহিনীর 'দৃঢ় ও পূর্ণ' নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এর কিছুক্ষণ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দাবি করেছিলেন যে, ইরান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। ট্রাম্প বলেন, 'হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ "উন্মুক্ত, অবাধ ও নিরাপদ" হলেই কেবল যুদ্ধবিরতি হতে পারে।'

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, 'তার আগ পর্যন্ত, আমরা ইরানে এমনভাবে হামলা চালাব যাতে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অথবা, কথায় যেমন বলে, আমরা তাদের প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব!’

উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আরও শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরান ও তার মিত্র ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ শেষ দফার হামলায় ১০০টিরও বেশি ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি অন্তত ২০০টি রকেট ছুড়েছে।

আইআরজিসির তথ্যমতে, এসব হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থান এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি ঘাঁটি এবং কুয়েতের আল-আদিরি ঘাঁটিতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ইউনিট রয়েছে। তাদের দাবি, সেখানে একটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে।

ইরানের সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে।

বাব আল–মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি: ইয়েমেনের সানা থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা ইউসেফ মাওরি জানিয়েছেন, হুতিরা বর্তমানে দক্ষিণ ইসরায়েলে তাঁদের হামলা জোরদার করছেন।

হুতি কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ হলেই শুধু এ হামলা বন্ধ করবেন তারা। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের অংশ না নেওয়া।

হুতিদের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি জানিয়েছেন, সামরিক সংঘাত আরও বাড়ানোর জন্য তাদের সামনে আরও অনেক বিকল্প ও ধাপ রয়েছে। তাঁর মতে, এর মধ্যে অন্যতম একটি বিকল্প হতে পারে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।

দ্রুত ইরান যুদ্ধের অবসান চান ৬৬ শতাংশ মার্কিন: যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন না হলেও দেশটির উচিত দ্রুত এ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গত শুক্রবার থেকে গত রোববার পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬৬ শতাংশ যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে ২৭ শতাংশ বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানে তাদের সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া। আর ৬ শতাংশ মানুষ এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি।

ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকদের যারা জরিপে অংশ নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যেও ৪০ শতাংশ মনে করেন, লক্ষ্য অর্জন না হলেও দ্রুত সংঘাত শেষ করা দরকার। অপরদিকে ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধে সম্পৃক্ত থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

১ হাজার ২১ জনের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেছেন। আর ৩৫ শতাংশ তা সমর্থন করেছেন।

‘হরমুজে অভিযান ন্যাটোর কাজ নয়’: হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য ন্যাটো গঠিত হয়নি বলে জানিয়ে দিয়েছেন ফ্রান্সের জুনিয়র সেনাবাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী অ্যালিস রুফো। প্যারিসে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এই জোটের সীমাবদ্ধতা ও কর্মপরিধি মনে করিয়ে দেন।

অ্যালিস রুফো বলেন, 'ন্যাটো আসলে কী, সেটি আমি আপনাদের আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই। এটি একটি সামরিক জোট যা মূলত ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট। হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযান চালানোর জন্য এটি তৈরি করা হয়নি; আর এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'

উল্লেখ্য, এর আগে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোকে 'কাপুরুষ' বলে অভিহিত করেছিলেন ট্রাম্প।

তেহরান শান্তি চায়: যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ সত্ত্বেও ইরান এখনো শান্তি বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোঘাদাম। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

রেজা আমিরি মোঘাদাম তাঁর পোস্টে চলমান সংকট নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বচ্ছতা রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ তোলেন।

ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও ইরান এর আগে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দুই দফা আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সংলাপের শক্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস এবং সদিচ্ছা থেকে ইরান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি শান্তিকামী জাতি হিসেবে ইরান সবসময় যুদ্ধের বদলে সংলাপকে বেছে নিয়েছে।’

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন