৫৩ বছর পর চাঁদে নভোচারী পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৫৩
ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যখন নভোচারীদের নিয়ে ক্যাপসুলটি রওনা হ
৫৩ বছরের বেশি সময় পর আবারো চাঁদের উদ্দেশে নভোচারী পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্থানীয় সময় গত বুধবার মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের চার নভোচারী কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে চড়ে এ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেন।
সর্বশেষ চাঁদে নভোচারী গিয়েছিল ১৯৭২ সালে। ওই সময় নাসার অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এবার প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে রওনা হলেন। একে চাঁদে আর মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যখন নভোচারীদের নিয়ে ক্যাপসুলটি রওনা হয়, সেটির উৎক্ষেপণ দেখতে সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হন।
নাসার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্যাপসুলটি প্রায় ১৫ ফুট চওড়া ও নয় ফুট উঁচু। উৎক্ষেপণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানান, নভোচারীরা ‘নিরাপদ, সুরক্ষিত ও অত্যন্ত উৎফুল্ল’ আছেন।
‘আর্টেমিস-২’ মিশনের চার নভোচারী হলেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। ১০ দিনের এই মিশনে তারা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
এই যাত্রার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘৫০ বছরের বেশি সময় পর আমেরিকা আবারো চাঁদে যাচ্ছে! আর্টেমিস-২ আমাদের সাহসী নভোচারীদের মহাকাশের অনেক গভীরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আগে কোনো মানুষ পৌঁছাতে পারেনি।’
মিশনটি মূলত চাঁদে স্থায়ীভাবে মানুষের বসতি স্থাপন এবং পরবর্তীতে মঙ্গল গ্রহে মহাকাশচারী পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দুর্গম দক্ষিণ মেরুতে আবার নভোচারী অবতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
উড্ডয়নের মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ক্যাপসুল থেকে আপ্লুত কণ্ঠে জানান, তারা একটি অপূর্ব চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছেন এবং সরাসরি চাঁদের অভিমুখেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
উৎক্ষেপণের আগে হাইড্রোজেনের বিপজ্জনক লিকেজ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও নাসা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সাত লাখ গ্যালন জ্বালানি লোড করে কোনো বড় ধরনের ত্রুটি ছাড়াই মিশনটি শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
যাত্রার পরবর্তী ধাপে নভোচারীরা প্রথম এক থেকে দুই দিন পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, প্রপালশন, নেভিগেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর মহাকাশযানটি একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন বার্নের মাধ্যমে পৃথিবীর কক্ষপথ ত্যাগ করে সরাসরি চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করবে।
পুরো যাত্রাপথে ওরিয়ন চাঁদকে ঘিরে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ ট্র্যাজেক্টরি অনুসরণ করবে, যেখানে চাঁদ ও পৃথিবীর অভিকর্ষ বলকে কাজে লাগিয়ে ন্যূনতম জ্বালানি ব্যয়ে মহাকাশযানটি পুনরায় পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে। এই পর্যায়ের একটি সময়ে মহাকাশচারীরা গত কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করবেন।
চাঁদকে প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীতে ফেরার সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।
নাসার বিজ্ঞান মিশন প্রধান নিকি ফক্সের মতে, বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ অ্যাপোলো মিশনের সময় জন্মায়নি, তাই আর্টেমিসই হতে যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের ‘অ্যাপোলো’।
মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি আশা করছে যে ২০২৬ সালের এই সফল মিশন আগামীতে চাঁদের মাটিতে পুনরায় মানুষের পা রাখার পথকে সুগম করবে। এই মিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছর পর মহাকাশ জয়ের নতুন এক উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
১০ দিন যা যা করবেন মহাকাশচারীÑ
উৎক্ষেপণের দিন: ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের মাধ্যমে আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর ওরিয়ন ক্রু ক্যাপসুলটি রকেটের উপরের ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর চারপাশে একটি উচ্চ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রবেশ করবে।
দিন ১-২; পৃথিবীর কক্ষপথে পরীক্ষা: প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে থাকবে ওরিয়নের জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, প্রপালশন, নেভিগেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার পরীক্ষা, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
ট্রান্সলুনার ইনজেকশন: সব পরীক্ষা শেষ হলে ওরিয়নের প্রপালশন সিস্টেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্ন সম্পন্ন করবে, যাকে ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ বলা হয়। এর মাধ্যমে মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে যাত্রাপথে প্রবেশ করবে।
দিন ৩-৪; চাঁদের পথে যাত্রা: চাঁদের দিকে কয়েক দিনের এই যাত্রার সময় নভোচারীরা মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করতে থাকবেন। এটি হবে এমন একটি মানববাহী মহাকাশযাত্রা, যা পৃথিবী থেকে পূর্বের যেকোনো অভিযানের তুলনায় আরও দূরে যাবে। মিশন নিয়ন্ত্রণ দল যোগাযোগ ও নেভিগেশন পর্যবেক্ষণ করবে।
চাঁদের পাশ দিয়ে অতিক্রম: ওরিয়ন একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ পথে চাঁদের পেছন দিয়ে অতিক্রম করবে। এটি এমন একটি কক্ষপথ, যা অতিরিক্ত প্রপালশন ছাড়াই মহাকাশযানটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনবে। এই পর্যায়ে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে।
দিন ৫-৮; পৃথিবীতে ফেরা: চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে আসার পর নভোচারীরা কয়েক দিন ধরে পৃথিবীতে ফেরার পথে থাকবে। এসময় তারা গভীর মহাকাশে বিভিন্ন অতিরিক্ত পরীক্ষা চালাবে, যেমন: শক্তি ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে ক্রু পরিচালনা।
পুনঃপ্রবেশ ও সাগরে অবতরণ: পৃথিবীর কাছে পৌঁছালে ওরিয়ন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাদা করবে এবং প্রায় ২৫ হাজার মাইল (৪০ হাজার ২৩৩ কিমি) গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এই উচ্চগতির পুনঃপ্রবেশের সময় ক্যাপসুলের তাপরোধী ঢালের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এরপর মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে, যেখানে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের উদ্ধার করবে।

