চরম দুর্ভিক্ষের শঙ্কায় ২৩ লক্ষ ফিলিস্তিনি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৪
গাজায় মানবিক সহায়তা নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের করা দাবিকে ‘ভুল এবং বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে গাজার কর্তৃপক্ষ। গত পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানে গাজায় সবচেয়ে বেশি ত্রাণ প্রবেশ করছে—ভ্যান্সের এমন মন্তব্যের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
তারা বলছে, মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি
হলেও বাস্তবে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ আগের চেয়ে অনেক কমেছে এবং পরিস্থিতি আবারও ‘বিপর্যয়কর’ রূপ নিয়েছে।
জেডি ভ্যান্সের দাবি বনাম বাস্তবতা: জেডি
ভ্যান্স দাবি করেন, মার্কিন প্রশাসন গাজা পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়ায় সেখানে
ত্রাণের প্রবাহ বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর জবাবে বুধবার গাজা সরকারের মিডিয়া
অফিস এক বিবৃতিতে জানায়, ভ্যান্সের এই দাবি বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ সংগতিহীন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই
সময়ে গাজায় ত্রাণের প্রবাহ বাড়ার বদলে উল্টো আশঙ্কাজনক হারে কমছে। গত জানুয়ারিতে যেখানে
৩,৫১৩টি ত্রাণের ট্রাক প্রবেশ করেছিল, সেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২,৬৬০ এবং মার্চে
২,০৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ৫৮৬টি ট্রাক গাজায়
প্রবেশ করতে পেরেছে।
চুক্তির শর্ত মানছে না ইসরায়েল: গত বছরের
অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলকে
প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ ট্রাক খাবার, জ্বালানি ও ওষুধ গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা
ছিল। কিন্তু গাজা মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, অক্টোবর থেকে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ২২৭টি ট্রাক
প্রবেশ করছে, যা চুক্তির মাত্র ৩৭ শতাংশ। গত ৯ এপ্রিল মাত্র ২০৭টি ট্রাক গাজায় ঢুকেছে,
যার মধ্যে মানবিক সহায়তার ট্রাক ছিল মাত্র ৭৯টি।
‘মনুষ্যসৃষ্ট’ দুর্ভিক্ষ ও
প্রাণহানি: দীর্ঘ দুই বছরের ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ইতিমধ্যে ৭২,০০০-এর বেশি মানুষ
নিহত এবং ১,৭০,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। যুদ্ধের পাশাপাশি ইসরায়েলি অবরোধের ফলে
গাজায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও ওষুধ সংকট।
আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স' অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে
ত্রাণ সরবরাহে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে এমন সব মৃত্যু ঘটছে যা সহজেই ঠেকানো সম্ভব ছিল।
সংস্থাটির মতে, যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত
ভয়াবহ।
হাহাকার গাজার জনপদে: গাজা সিটির বাসিন্দা
৪৫ বছর বয়সী সাবরিন আবু ওদা সংবাদমাধ্যমকে জানান, "আমরা আবারও চরম দুর্ভিক্ষের
দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বাজারে রুটি নেই, জ্বালানি নেই। শাকসবজির দাম আকাশচুম্বী, আর ডিম
বা মাংস তো এখন বাজার থেকে একরকম অদৃশ্য হয়ে গেছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসন যখন
ত্রাণ প্রবাহ বৃদ্ধির কৃতিত্ব দাবি করছে, তখন মাঠপর্যায়ের এই পরিসংখ্যান তাদের দাবির
অন্তঃসারশূন্যতাকেই প্রমাণ করে। ইসরায়েল কর্তৃক ত্রাণের পথ সংকুচিত করার এই নীতি গাজার
২৩ লক্ষ মানুষকে এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানের গরমিল: মার্কিন চুক্তিতে
প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণের কথা থাকলেও বাস্তবে আসছে মাত্র ৩৭ শতাংশ (গড়ে ২২৭টি)।
ক্রমাগত পতন: জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে
ত্রাণের ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৮৫ শতাংশ কমেছে। এপ্রিলে এ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৪০টিরও
কম ট্রাক ঢুকেছে।
ইসরায়েলি বাধা: 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স'
অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রাণ আটকে দিয়ে ‘প্রতিরোধযোগ্য
মৃত্যু’ ত্বরান্বিত করছে।
খাদ্য সংকট: গাজা সিটিতে রুটি, জ্বালানি
এবং মাংসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে; সবজির দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

