মহাসাগরের প্রমোদতরীতে রহস্যময় হান্টাভাইরাস, মৃত্যু ৩
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ২১:২৮
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও গভীরতম মহাসাগর আটলান্টিকে একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরী আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে কেপ ভার্দের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিণত হয়েছে আতঙ্কের কেন্দ্রে।
অজানা উপসর্গে অসুস্থ হয়ে পড়া যাত্রীদের মধ্যে পরে শনাক্ত হয়েছে বিরল ও প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ। রহস্যজনক এই হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি সতর্কতা জারি করেছে, আর সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে শুরু হয়েছে ব্যাপক তদন্ত ও সমন্বিত পদক্ষেপ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনা থেকে কেপ ভার্দেগামী এমভি হোনডিয়াস জাহাজে একজনের শরীরে ভাইরাসটি নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছে এবং আরও অন্তত পাঁচ যাত্রী আক্রান্ত হতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ডব্লিউএইচও জানায়, আক্রান্ত ছয়জনের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন এবং একজন বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
এছাড়া যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে।
হান্টাভাইরাস ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়া একটি বিরল রোগ। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন এমভি হন্ডিয়াস নামের ওই প্রমোদতরীতে সম্ভাব্য এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে তদন্ত করছে।
সংস্থাটি জানায়, বিস্তারিত তদন্ত চলছে, যার মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও মহামারিবিদ্যাগত বিশ্লেষণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যাত্রী ও ক্রুদের চিকিৎসা ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে এবং ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণও চলমান রয়েছে।
ডব্লিউএইচও আরও জানায়, আরও দুই যাত্রীর মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।
এদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, প্রমোদতরীটিতে ‘তীব্র শ্বাসযন্ত্রজনিত অসুস্থতার’ প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এতে অন্তত দুজন মারা গেছেন এবং আরেকজন জোহানেসবার্গে নিবিড় পরিচর্যায় আছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফস্টার মোহালে নিশ্চিত করেন, জোহানেসবার্গে চিকিৎসাধীন রোগীর শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। প্রথমে ৭০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি অসুস্থ হন। তিনি প্রমোদতরীতেই মারা যান। তার লাশ বর্তমানে দক্ষিণ আটলান্টিকের ব্রিটিশ ভূখণ্ড সেন্ট হেলেনা দ্বীপে রাখা হয়েছে বলে জানান মুখপাত্র। পরে তার ৬৯ বছর বয়সি স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়। পরে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
মোহালে এএফপিকে জানান, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা কোন দেশের নাগরিক তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তবে নিবিড় পরিচর্যায় থাকা ৬৯ বছর বয়সি ওই ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ নাগরিক বলে এএফপি জানিয়েছে।
যেভাবে ছড়ায় হান্টাভাইরাস: হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মূত্র, মল বা লালার সংস্পর্শে ছড়ায়। বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়ার মৃত্যুর পর এ ভাইরাসটি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এই ভাইরাসে সাধারণত দুটি গুরুতর রোগ হতে পারে— ফুসফুস আক্রান্ত করে এমন হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম এবং কিডনি আক্রান্ত করে এমন হেমোরেজিক জ্বর।
যদিও বিরল তবে কিছু ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা প্রতিষেধক নেই। তবে দ্রুত চিকিৎসা পেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জাহাজটিকে ঘিরে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ল্যাব পরীক্ষা, সংক্রমণ ছড়ানোর ধরণ বিশ্লেষণ এবং ভাইরাসের জিনগত সিকোয়েন্সিং চলছে। যাত্রী ও ক্রুদের চিকিৎসা সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, ডাচ পতাকাবাহী এমভি হন্ডিয়াস নামের জাহাজটি প্রায় তিন সপ্তাহ আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করে। এর রুটে ছিল অ্যান্টার্কটিকা, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন গন্তব্য। শেষ পর্যন্ত এটি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ-এ পৌঁছানোর কথা ছিল।
এদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার সংক্রামক রোগ ইনস্টিটিউট জোহানেসবার্গ এলাকায় সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা লোকজন শনাক্ত করতে কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পুরো পরিস্থিতির ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে এবং জাহাজে থাকা যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

