Logo

আন্তর্জাতিক

নতুন মিত্রের সন্ধানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ২০:৪২

নতুন মিত্রের সন্ধানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ

ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ

পশ্চিম আফ্রিকায় নিজেদের সাবেক উপনিবেশগুলোতে একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর এবার নতুন মিত্রের সন্ধানে নেমেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো কোনো অ-ফরাসি ভাষাভাষী দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহাসিক ফ্রান্স-আফ্রিকা শীর্ষ সম্মেলন। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আফ্রিকা মহাদেশে ফ্রান্স তার ভূমিকার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে চাইছে।

মঙ্গলবার নাইরোবিতে শুরু হওয়া এই শীর্ষ সম্মেলনের নাম দেওয়া হয়েছে আফ্রিকা ফরোয়ার্ড’। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত ফ্রান্সের পক্ষ থেকে নতুন মিত্রদের কাছে টানার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। সম্মেলনে ৩০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান যোগ দিয়েছেন। এছাড়া আফ্রিকান ইউনিয়ন, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন খাতের প্রতিনিধিরা জ্বালানি রূপান্তর, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। সোমবার থেকেই যুব সমাজ, সৃজনশীল শিল্প ও ক্রীড়া বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে সম্মেলনের আবহ তৈরি করা হয়। আয়োজকদের দাবি, এই আয়োজন আফ্রিকা ও ফ্রান্সের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তনের প্রতিফলন।

কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো তাঁর স্বাগত বার্তায় বলেন, এই উচ্চপর্যায়ের সমাবেশ আফ্রিকা ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি নবায়নকৃত এবং ভবিষ্যৎমুখী অংশীদারত্বের প্রতিফলন ঘটায়। এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।” অন্যদিকে, ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমরা সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই, যা ভাগ করে নেওয়া স্বার্থ এবং দৃশ্যমান ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। আফ্রিকা ফরোয়ার্ড’ সম্মেলন সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।”

কয়েক দশক ধরে ফ্রান্স তার সাবেক উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব বজায় রাখতে ফ্রঁসাফ্রিক’ নীতি ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে ফ্রান্স চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। মালি, নাইজার ও চাদের মতো দেশগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থান এবং ফ্রান্স-বিরোধী মনোভাবের কারণে প্যারিসকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করতে হয়েছে। নব্য-উপনিবেশবাদ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগে ফরাসি প্রভাব আজ সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মিখাইল নিয়ামওয়েয়া বলেন, “ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ে জমি হারানোর পর ফ্রান্স এখন তার পুরনো ফরাসি ভাষাভাষী গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। নাইরোবির মতো একটি ইংরেজি ভাষাভাষী কূটনৈতিক কেন্দ্রকে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো—ফ্রান্স তার আফ্রিকান নীতিকে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে, যা হবে আরও বেশি অর্থনৈতিক এবং ঔপনিবেশিক অতীত থেকে মুক্ত।”

এই সম্মেলন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর জন্যও একটি বড় সুযোগ। তিনি কেনিয়াকে একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সম্মেলনের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। গত বছর ফ্রান্স ও কেনিয়ার মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার অধীনে সম্প্রতি ৮০০ ফরাসি সামরিক সদস্য প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা মহড়ার জন্য কেনিয়ায় পৌঁছেছেন। যদিও কেনিয়ার বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ এই চুক্তির সমালোচনা করে বলেছে যে, এটি দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মাচারিয়া মুনেনে মনে করেন, বিশ্বমঞ্চে নিজের নেতৃত্ব সুসংহত করতে ম্যাক্রোঁ এখন আফ্রিকায় নতুন সঙ্গীর খোঁজ করছেন। আর এক্ষেত্রে ম্যাক্রোঁ ও রুটোর স্বার্থের একটি চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।

রোববার নাইরোবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর অনুপস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। মালি, বুর্কিনা ফাসো এবং নাইজারের নেতারা উপস্থিত না থাকলেও, ওই দেশগুলোর শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। ম্যাক্রোঁ বলেন, আমরা ওই সব দেশের সরকারের সাথে একমত না হতে পারি, কিন্তু আমরা জনগণের সাথে দ্বিমত পোষণ করি না। আমরা এই অঞ্চলের মানুষকে ভালোবাসি।”

নাইরোবির এই সম্মেলন কি পারবে ফ্রান্সের ক্ষয়ে যাওয়া প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে? নাকি এটি কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে? বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের এই নতুন পথচলা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তারা আফ্রিকার দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে কতটা সম্মান দিতে পারে তার ওপর।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন