পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে। ইসরায়েল ইস্যুতেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা যখন ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করছেন, তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের আরও কাছে ঘেঁষেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর হামলা না করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধের ফলে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পরও ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় অক্ষত রয়েছে এবং দেশটির সরকারের পতনের কোনো লক্ষণ নেই।
যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও ইরান থেকে হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হতে হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে এসব দেশকে চাপ দিয়ে আসছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে সৌদি আরব ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। তবে আবুধাবির অবস্থান সৌদি আরবের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী। যেমন সৌদি আরব তার ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার যে চেষ্টা করছে, আরব আমিরাত তার বিরোধিতা করছে।
ইরানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে চুক্তির প্রস্তাব সৌদির: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং ইরানকে নিয়ে আগ্রাসনবিরোধী একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরব। ইউরোপে স্নায়ুযুদ্ধের সময় উত্তেজনা কমাতে করা ১৯৭০–এর দশকের একটি চুক্তির আদলে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমর্থন পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই উদ্যোগকে সমর্থন করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরব মূলত ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক হেলসিংকি অ্যাকর্ডসকে মডেল হিসেবে ধরে এই নতুন চুক্তির খসড়া তৈরি করছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের সীমানাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে সব পক্ষ মানবাধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে একমত হয়েছিল।
আরব এক কূটনীতিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এমন একটি চুক্তিকে ‘বেশির ভাগ আরব ও মুসলিম দেশের পাশাপাশি ইরানও’ স্বাগত জানাবে। তবে ইরান এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা কমাতে পারে, এমন যেকোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করবে ইসরায়েল। এ ছাড়া কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো এই চুক্তিতে কীভাবে সমাধান করা হবে, তা–ও পরিষ্কার নয়।
তেহরান এই জলপথের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায় এবং সেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য নিজস্ব টোল ব্যবস্থাও চালু করেছে।
ইরান হয় চুক্তি করবে, না হয় ধ্বংস হবে- ট্রাম্প: ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে ‘ধ্বংস’ বা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে দেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান, ইরানকে হয় একটি চুক্তিতে আসতে হবে, অন্যথায় তারা ধ্বংসের শিকার হবে। তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার এই বক্তব্যকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠোর বাগাড়ম্বর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান সম্প্রতি ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তিনি বলেন, ইরান ভূগর্ভ থেকে কিছু মিসাইল বের করেছে এবং এগুলো মাত্র এক দিনের মধ্যেই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। তবে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি কিছুটা মিশ্র মূল্যায়ন দিয়েছেন।
ট্রাম্প মনে করেন, দেশটির বর্তমান কর্মকর্তারা আগের পর্যায়ের নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি বিচক্ষণ এবং যৌক্তিক। তার মতে, ইরানের আলোচনা করার ধরনেও এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তার ধৈর্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি তেহরানকে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমি আর খুব বেশি ধৈর্য ধরতে পারছি না। তাদের একটি চুক্তিতে আসা উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যেই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এলো। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ভূখণ্ড থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ট্রাম্প কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, জনমতের বিষয়টি বাদ দিলে এই ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া আসলে খুব বেশি জরুরি কোনো বিষয় নয়। তবে তার ভাষায় ‘ভুয়া সংবাদ’ বা ফেক নিউজ ডটকমগুলোর কাছে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই ইউরেনিয়াম সংগ্রহের কথা বলেছিলেন এবং এটি বাস্তবায়নে তিনি বদ্ধপরিকর।
ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের এই কট্টর অবস্থান এবং সরাসরি সামরিক হামলার হুমকি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, ইরান তার এই বার্তাগুলো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করছে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিবর্তে একটি আলোচনার পথ বেছে নেবে। অন্যথায় এক ভয়াবহ সংঘাতের জন্য ইরানকে প্রস্তুত থাকতে হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় ইরান আরও শক্তিশালী- খামেনি: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, দেশের ‘সাহসী প্রতিরোধ’ ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী করেছে।
গতকাল জাতীয় ফার্সি ভাষা সংরক্ষণ দিবস এবং খ্যাতিমান কবি ফেরদৌসিকে স্মরণ করে দেওয়া এক বিবৃতিতে খামেনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক পবিত্র প্রতিরোধে (যুক্তরাষ্ট্র-জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে) ইরান প্রমাণ করেছে যে ফেরদৌসির কিংবদন্তির গল্পগুলো শুধু কল্পনা নয়, বরং সেগুলো ইরানিদের জীবনের বাস্তবতা এবং তাদের বীরত্বপূর্ণ চরিত্রের প্রতিফলন।’
খামেনি বলেন, ফেরদৌসির মহাকাব্য ‘শাহনামা’র বীরত্বপূর্ণ ও কোরআনপ্রাণ ধারণাগুলো ইরানের সব জাতিগোষ্ঠী ও সামাজিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঐক্য দেশটির পরিচয়, স্বাধীনতা ও ‘জাহাকসদৃশ আগ্রাসীদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরানি পুরাণে ‘জাহাক’কে অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খামেনি সেই প্রতীক ব্যবহার করে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই ইরানের- আরাগচি: ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভবিষ্যৎ কূটনীতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি তেহরানের মূল অবস্থান ও উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের বিন্দুমাত্র কোনো আস্থা বা ‘বিশ্বাস নেই’। এই আস্থার সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক জটিলতা কাজ করছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তিনি ওয়াশিংটনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসতে তখনই রাজি হবে, যখন অপর পক্ষ বা মার্কিন প্রশাসন এই প্রক্রিয়ার প্রতি সম্পূর্ণ আন্তরিক ও ‘সিরিয়াস’ হবে। কেবল লোকদেখানো কোনো সংলাপে তেহরান অংশ নেবে না।
বিদ্যমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে এই ইরানি শীর্ষ কূটনীতিক উল্লেখ করেন যে ইরান বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোনো উপায়ে কূটনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ দেওয়া। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন যে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থার চরম ঘাটতি এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যেকোনো ধরনের ইতিবাচক আলোচনার অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

