ট্রাম্প-নেতানিয়াহুকে হত্যায় পুরস্কারে বিল পাস করছে ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ২০:৩০
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে হত্যার জন্য একটি বিশাল অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার বা ‘বাউন্টি’ ঘোষণার আইন পাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের পার্লামেন্ট।
দেশটির মজলিস বা সংসদে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের
সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা বা পারস্পরিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ’ শিরোনামে একটি
নতুন বিল পাসের প্রক্রিয়া চলছে। এই বিলের অধীনে মার্কিন ও ইসরায়েলি শীর্ষ নেতাদের হত্যাকারীকে
আইনিভাবে সরকারি তহবিল থেকে ৫ কোটি ইউরো (যা প্রায় ৫৮ দশমিক ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
বা ৪৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ড) পুরস্কার দেওয়া বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এবং ‘ইরান ওয়ার’-এর পৃথক প্রতিবেদনে
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ
বাহিনীর চালানো ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ
আলী খামেনি নিহত হন। ইরানের পক্ষ থেকে এই বিলটিকে খামেনি হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রতিশোধমূলক
আইনি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র
নীতি বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই বিলটির খসড়া
তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সর্বোচ্চ
নেতা বা ইমাম যেভাবে শহীদ হয়েছেন, তার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
জঘন্য প্রেসিডেন্ট, কলঙ্কিত জায়নবাদী প্রধানমন্ত্রী এবং সেন্টকম কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু
করা আমাদের অধিকার। যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা সংস্থা এই ধর্মীয় ও আদর্শিক মিশন সফল
করতে পারে, তবে সরকার তাকে এই ৫ কোটি ইউরো পুরস্কার দিতে বাধ্য থাকবে।”
একই কমিটির প্রভাবশালী সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, জুয়াড়ি ট্রাম্প এবং শিশুহত্যাকারী
নেতানিয়াহুকে ‘জাহান্নামে পাঠাতে’ পারা ব্যক্তির
রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের এই বিলটির ওপর খুব শীঘ্রই ইরানি পার্লামেন্টে চূড়ান্ত ভোট অনুষ্ঠিত
হতে যাচ্ছে।
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, ইরানের ওপর আর কোনো হামলা
হলে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নয়, তাদের সহায়তাকারী আঞ্চলিক আরব দেশগুলোকেও পাল্টা
আঘাত করা হবে। সংসদে এই বিল আনার পাশাপাশি ইরানের জান্তা বা সরকার সমর্থিত প্রভাবশালী
মিডিয়া আউটলেট ‘মাসাফ’ দাবি করেছে যে,
তারা ইতিমধ্যেই ‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা)
নামক একটি বিশেষ অভিযানের জন্য ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পৃথক একটি আর্থিক তহবিল সুরক্ষিত
করেছে।
এরই মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাধীন
সাইবার যুদ্ধ পরিচালনাকারী হ্যাকিং গ্রুপ ‘হান্দালা’ একটি পৃথক বিবৃতি
দিয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ এই হ্যাকিং গ্রুপের সদস্যদের সন্ধান দেওয়ার জন্য ১০ মিলিয়ন
ডলার পুরস্কার ঘোষণা করার পর তার পাল্টা জবাব হিসেবে হান্দালা জানায়, তারা ট্রাম্প
ও নেতানিয়াহুকে ‘নিপীড়ন ও দুর্নীতির প্রধান কারিগর’ আখ্যা দিয়ে তাদের
হত্যার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।
হ্যাকিং গ্রুপটি স্পষ্ট করেছে যে, এনক্রিপশন
ও অ্যানোনিমাস প্রযুক্তির সুরক্ষায় থাকা তাদের এই ফান্ড থেকে যে কেউ এই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের
বিরুদ্ধে ‘বাস্তব পদক্ষেপ’ নিতে পারবে,
তাকেই এই অর্থ প্রদান করা হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই
প্রস্তাবিত বাউন্টি আইনটি দেশটির পূর্ববর্তী যেকোনো মৌখিক হুমকি, প্রচারণা বা ধর্মীয়
ফতোয়ার চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে
বর্তমানে চলমান অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনাকে চূড়ান্তভাবে হুমকির
মুখে ফেলেছে।
এই বাউন্টি বা পুরস্কারের খবরটি এমন এক
সময়ে সামনে এলো যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি সংশোধিত ও আপডেট
করা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাবটিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান
করেছে। মার্কিন প্রশাসন ও শীর্ষ কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে জানিয়েছেন,
ইরানের এই নতুন ১৪ দফা প্রস্তাবে তেহরানের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে ভালো কোনো অগ্রগতি
বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই।
মার্কিন এক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে
বলেন, “আমরা পারমাণবিক
কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সাথে একটি গম্ভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনা আশা করছি। যদি তা না হয়, তবে
আমাদের বোমার ভাষায় কথা বলতে হবে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে।”
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি
দিয়ে লিখেছেন, “ইরানের জন্য ঘড়ির কাঁটা দ্রুত টিকটিক করছে। তারা যদি
দ্রুত শান্তি চুক্তিতে না আসে, তবে তাদের অস্তিত্বের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময়
ফুরিয়ে আসছে!”
এর আগে তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, তেহরান
যদি তাকে হত্যার কোনো চেষ্টা করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ
দেওয়া হবে যাতে ইরানকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। দুই পক্ষের এই
পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও একটি চরম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের
দিকে মোড় নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

