অভিবাসন নিয়ে রাজনীতি
লিবারেল পার্টির নেতার সমালোচনা করে দলছুট সিনেটর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ২০:৪৮
অস্ট্রেলিয়ায় আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিবাসন এবং অভিবাসীদের কল্যাণ তহবিল (ওয়েলফেয়ার) বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে প্রধান বিরোধী দল ‘লিবারেল পার্টি’র ভেতরে তীব্র কোন্দল ও বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। দলেরই অন্যতম শীর্ষ নেতা অ্যাঙ্গাস টেলরের নেওয়া ‘নেতিবাচক অভিবাসন নীতির’ তীব্র সমালোচনা করে দলছুট হয়েছেন লিবারেল সিনেটর অ্যান্ড্রু ম্যাকলাচলান।
তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন,
“দেশের অর্থনৈতিক
সংকটের জন্য আমরা অভিবাসীদের এভাবে অনবরত বলির পাঁঠা বানাতে পারি না।”
গত সপ্তাহে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী
দলের নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর ঘোষণা করেন, আগামী নির্বাচনে জোট সরকার (কোয়ালিশন) ক্ষমতায়
এলে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক নন—এমন অভিবাসীদের জন্য ‘জবসিক্যার’ (বেকারত্ব ভাতা),
বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা এবং এনডিআইএস (জাতীয় প্রতিবন্ধী বীমা স্কিম)-সহ ১৭ ধরনের
কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সামাজিক সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এমনকি যারা ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ (পার্মানেন্ট
রেসিডেন্ট) হিসেবে কর দিচ্ছেন, তারাও এই সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে তিনি আবাসন সংকটের
দোহাই দিয়ে সাময়িক অভিবাসীদের আগমন নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনারও প্রতিশ্রুতি দেন।
অ্যাঙ্গাস টেলরের এই উগ্র নীতির বিরুদ্ধে
মঙ্গলবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল সিনেটর অ্যান্ড্রু
ম্যাকলাচলান। তিনি ‘এবিসি আরএন ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে বলেন,
“আমি একটি বহুসাংস্কৃতিক
সমাজ থেকে এসেছি। এই নীতি কার্যকর হলে সমাজে দুই ধরনের সদস্য বা শ্রেণির সৃষ্টি হবে।
যারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমান অবদান
রাখছে, তাদের একজনকে সুবিধা দেওয়া হবে আর অন্যজনকে বঞ্চিত করা হবে—এটি কখনোই অস্ট্রেলিয়ার
ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি (অস্ট্রেলিয়ান ওয়ে) হতে পারে না। এই ধরনের নেতিবাচক ও আক্রমণাত্মক
প্রচারণার কারণে গত দুটি নির্বাচনে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী লিবারেল পার্টি থেকে
মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো
টেলরের এই নীতিকে বর্ণবাদী ও সস্তা রাজনীতির ‘ডগ-হুইসল’ (সুনির্দিষ্ট
কোনো গোষ্ঠীকে টার্গেট করে উসকানিমূলক বক্তব্য) বলে নিন্দা জানিয়েছে। ‘ডেমোক্রেসি ইন
কালার’-এর জাতীয় পরিচালক
নুরা মনসুর বলেন, “আমরা ট্রাম্পের আমেরিকায় বাস করছি না যে
এমন নীতি চাপিয়ে দেওয়া হবে।”
বিরোধী দল লিবারেল পার্টির নেতারা যুক্তি
দিচ্ছেন, এই ভাতার ওপর নিষেধাজ্ঞা মূলত অভিবাসীদের অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণে উৎসাহিত
করবে। তবে সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বের আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন
করতেই একজন অভিবাসীকে বৈধ ভিসা নিয়ে কমপক্ষে চার বছর দেশটিতে বসবাস করতে হয়।
ফলে এই দীর্ঘ সময় তীব্র সংকটেও তারা কোনো
সরকারি সাহায্য পাবেন না। এছাড়া চীনসহ বেশ কিছু দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না,
ফলে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নিলে ওইসব দেশের অভিবাসীরা তাদের নিজ দেশের অধিকার হারাবেন।
দক্ষ অভিবাসন সংক্রান্ত একটি সংসদীয় তদন্ত
কমিটির শুনানিতে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী লেয়া উইলিয়ামস ভিজি বলেন, “অভিবাসীরা আবাসন
সংকট তৈরি করেনি এবং অভিবাসন কমালেই এই সংকটের সমাধান হবে না। উল্টো এটি দেশের স্বাস্থ্য
ও সেবা খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় (কেয়ার ক্রাইসিস) ডেকে আনবে। আমাদের ইতিমধ্যে ডাক্তার,
নার্স ও ফিজিওথেরাপিস্টের তীব্র সংকট রয়েছে।” ‘বিজনেস কাউন্সিল
অব অস্ট্রেলিয়া’-ও অভিবাসী কমানোর ফলে তীব্র শ্রমিক সংকটের
পূর্বাভাস দিয়েছে।
এই রাজনৈতিক দ্বৈরথ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ লিবারেল পার্টি ও অ্যাঙ্গাস টেলরকে তীব্র আক্রমণ
করে বলেছেন, তারা মূলত কট্টর ডানপন্থী দল ‘ওয়ান নেশন’-এর ভোট ব্যাংক
নিজেদের দিকে টানতে সস্তা রাজনীতি করছেন।
অ্যালবানিজ বলেন, “আমাদের কাজ অস্ট্রেলীয়দের
মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নয়, আমাদের উচিত সবাইকে একসাথে নিয়ে চলা।” এছাড়া দেশটির
বহুসাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী অ্যানি আলি অভিযোগ করেছেন, টেলরের এই নীতি স্থায়ী বাসিন্দাদের
দেশের জন্য ‘বোঝা’ হিসেবে চিত্রায়িত
করছে, যা অত্যন্ত অবমাননাকর।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

