যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার হামলা শুরু করলে ‘আরও বড় চমক’ দেখাতে বাধ্য হবে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যেগাাযোগমাধ্যম এক্সে এ সতর্কবার্তা জানিয়েছেন।
পোস্টে আরাগচি বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পর মার্কিন কংগ্রেস স্বীকার করেছে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান হারিয়েছে, যার সম্মিলিত মূল্য শত শত কোটি ডলার। তিনি দাবি করেন, প্রথম যে মার্কিন বিমানটি ভূপাতিত হয়েছে সেটি ছিল অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীই এটি ধ্বংস করেছে।
আরাগচি আরও বলেন, এ যুদ্ধ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি নিশ্চিত যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ফের হামলা চালায়, তবে ইরান তাদের জন্য আরও অনেক বড় চমক তৈরি করবে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ উত্তেজনার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রায় ৪০ দিন যুদ্ধ চলার পর ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা এখনও চলছে। তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে ফের বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন আর যুদ্ধ করতে হবে না, কিন্তু প্রয়োজনে ইরানের ওপর আরেকটি বড় আঘাত হানা সম্ভব। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরাগচি তার জবাবি পোস্ট করেন।
এদিকে, টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে আশারা আলো দেখা গেলেও ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ্যের কারণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এতে বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং তেলের দামও অনেক বেড়ে গেছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। গত মঙ্গলবার রাজধানী জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে স্মোতরিচ নিজেই এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্মোতরিচ বলেন, সোমবার রাতে হেগের ইহুদিবিদ্বেষী আদালত আমার নামে গোপন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের ভিত্তিতে এটি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারির মাধ্যমে আইসিসি আসলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা চায় ইসরায়েল নিরাপত্তার দিক থেকে আত্মহত্যা করুক। এজন্যই এসব পরোয়ানা ও নিষেধাজ্ঞা। যারা চিরকাল ইসরায়েলের বিরোধিতা করে আসছে, সেই পক্ষপাতদুষ্ট সংস্থাগুলোর কোনো নির্দেশ আমরা মানব না।
ইসরায়েলের দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং দখলদারিত্বের অভিযোগে আইসিসি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তিনজন কর্মকর্তা এবং দুজন রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। দুই রাজনীতিবিদের একজন বেজালেল স্মোতরিচ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, অপর রাজনীতিবিদ হলেন জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে তিনিও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ। তবে আইডিএফের তিন কর্মকর্তার নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
স্মোতরিচ সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, আমাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও বাইবেলে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে জুডিয়া ও সামারিয়া (বর্তমান পশ্চিম তীর) ইহুদিদের মাতৃভূমি। আমরা শুধু আমাদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
আইসিসির এই পদক্ষেপকে ইসরায়েল সরকার সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এটিকে ইহুদিবিদ্বেষী ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছে।
ইসরায়েলি হামলায় দক্ষিণ লেবাননে নিহত ১৬: দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জনের বেশি মানুষ। লেবাননের চিকিৎসা ও স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর থেকে দেশটিতে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২ জনে। এর পাশাপাশি আহত মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে ৯ হাজার ৩০১ জনে ।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি ঘটেছে টাইর জেলার দেইর কানুন আল-নাহর শহরে। সেখানে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের আঘাতে নারী ও শিশুসহ ১০ জন প্রাণ হারান। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ওই এলাকার ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে ।
অন্য একটি হামলায় কফারসির শহরের আল-মাহফারা এলাকায় একটি আবাসিক বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে ওই বাড়ির বাসিন্দা দুই নারীসহ চারজন নিহত হন। এ ছাড়া নাবাতিয়েহ জেলার হারুফ শহরে পৌর ভবনের কাছে এবং বিনত জবেইল জেলার ফ্রুন শহরে একটি মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে পৃথক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই দুটি ড্রোন হামলায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
একই দিন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ লেবাননের কফাররিমান, কাফরা, কফারদৌনিন, আল-শাহাবিয়া, আল-রাইহান, জাওতার আল-শারকিয়া, আল-কুসাইবা, দেইব্বিন, মারাকা, আল-বাজুরিয়া, আল-মাজাদেল, আল-হাউশ-টাইর এলাকা এবং নাবাতিয়েহ শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে উপর্যুপরি বিমান হামলা চালায়।
এর জবাবে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ধারাবাহিক হামলা চালানোর দাবি করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি জানায়, তারা দোভিভ বসতিতে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের ওপর এবং মিসগাভ আম এলাকায় একটি সামরিক যান লক্ষ্য করে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমও নিশ্চিত করেছে যে, মিসগাভ আমের কাছে একটি গাড়িতে হামলায় একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
ইরানের জন্য হরমুজের বিকল্প রাশিয়ার করিডোর: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ চলমান। কোনক্রমেই প্রণালিটি খুলতে সক্ষম না হওয়ায় ইরানের নৌ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালি এবং অন্য সমুদ্রপথে ইরানের জাহাজ আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবস্থায় ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রাশিয়ার সাথে থাকা ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (আইএনএসটিসি)। এই করিডোরের আওতায় রয়েছে জাহাজ চলাচল পথ, রেলপথ এবং সড়ক পথ। এই সব পথ ব্যবহার করে ইরান রাশিয়া থেকে প্রয়োজনীয় শস্য, যন্ত্রপাতি এবং শিল্পসামগ্রী আমদানি করতে সক্ষম।
থিঙ্ক মার্কেট এর বিশ্লেষক নাঈম আসলাম আল জাজিরাকে বলেন, করিডোরটির ফলে ইরান পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রিত সমুদ্রপথ এড়িয়ে বাণিজ্য করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে এই করিডোরকে বলা যায় ইরানের জন্য যুদ্ধকালীন লাইফলাইন।
তিনি আরো বলেন, কাস্পিয়ান সাগরের কাছে ভলগা নদীর ব-দ্বীপে অবস্থিত আস্ত্রাখান বন্দর এবং কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত মাখাচকালা বন্দর দুটি শস্য, ধাতু, কাঠ এবং পরিশোধিত পণ্যের আমদানি এবং রপ্তানির আকস্মিক বৃদ্ধি সামাল দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ২০২৩ সালে মস্কো এই করিডোরটিতে অর্থায়ন করতে রাজি হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে একটি মহৎ উদ্যোগ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিশ্বে বাণিজ্যে বৈচিত্র্য বাড়বে। তবে বিশ্লেষকরা বলছে, এই করিডোরটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘকালে হরমুজ প্রণালির বিকল্প নেই।
হরমুজ নিয়ে চীন-রাশিয়ার যৌথ বিবৃতি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ‘একতরফাভাবে’ হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। গতকাল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কিছু নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, আন্তঃরাষ্ট্রীয় জোট এবং তাদের মিত্রদের একতরফা পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে বাধাগ্রস্ত করে, তা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অখণ্ডতা এবং সামগ্রিকভাবে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।’
বিবৃতিতে নির্দিষ্ট করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এটি হরমুজ প্রণালির দিকে ইঙ্গিত করছে। চীন ও রাশিয়া আরও বলেছে, ‘বন্দরসহ সামুদ্রিক অবকাঠামোতে সহযোগিতা বাজারভিত্তিক ও বাণিজ্যিক নীতির ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, যাতে রাজনৈতিকীকরণ এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা চেষ্টা এড়ানো যায়।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল-গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

