Logo

আন্তর্জাতিক

মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ

ইবোলার নতুন স্ট্রেইনে কাঁপছে আফ্রিকা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ২১:১১

ইবোলার নতুন স্ট্রেইনে কাঁপছে আফ্রিকা

ইবোলা

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) এবং উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল ও অত্যন্ত বিপজ্জনক স্ট্রেইন নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইবোলার এই নতুন ধরনটির নাম 'বান্ডিবুগিও'। সংস্থাটি এটিকে "আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা" হিসেবে ঘোষণা করেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই নতুন স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে চিকিৎসকদের হাতে নেই। আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই স্ট্রেইনের মৃত্যুহার প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। ফলে দীর্ঘ এক দশক পর আফ্রিকায় আবারও এক বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এবারের প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল বা গ্রাউন্ড জিরো’ হলো ডিআরসি-এর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ। স্বর্ণ খনির হাব হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটি থেকে নিয়মিত মানুষ উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানে যাতায়াত করে। ফলে ইতিমধ্যেই ইবোলা এই সীমান্তগুলো অতিক্রম করেছে। কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল রজার কাম্বা জানিয়েছেন, কঙ্গোতেই এ পর্যন্ত ৫১৩ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ২৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রতিবেশি দেশ উগান্ডায় ইতিমধ্যে একজন মারা গেছেন এবং আরও দুজন আক্রান্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির ১২০ জনেরও বেশি নাগরিককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস জেনেভায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "এই মহামারির গতি এবং বিস্তার আমাদের অত্যন্ত চিন্তিত করে তুলেছে।" কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে রাস্তায় বিক্রেতা থেকে শুরু করে মোটরবাইক চালক—সবাইকে মাস্ক পরে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। টেক্সাসের ইউটি সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্রুটিকা কুপ্পালি আল জাজিরাকে জানান, ২০১৪-১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় যে ইবোলা মহামারি ১১ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, সেটি ছিল 'জাইর' স্ট্রেইন। কিন্তু এবারের 'বান্ডিবুগিও' স্ট্রেইনটি সম্পূর্ণ আলাদা।

তিনি বলেন, "আঞ্চলিক সশস্ত্র সংঘাত, লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে রোগটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, স্থানীয় ল্যাবগুলোর ডায়াগনস্টিক সিস্টেম জাইর’ স্ট্রেইন শনাক্তের জন্য তৈরি, যা এই নতুন স্ট্রেইনটি সঠিকভাবে ধরতে পারছে না। ফলে প্রাথমিক বহু রোগী শনাক্তের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।"

বর্তমানে ইবোলার এই স্ট্রেইনের কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই। মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মার্ক -এর তৈরি 'আরভেবো' নামের একটি ভ্যাকসিন জাইর স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে সফল হলেও, ল্যাব পরীক্ষায় বান্ডিবুগিও স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে তা সামান্য কার্যকর বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা একদম শূন্য থেকে শুরু করছেন না, কারণ ইবোলার পূর্ববর্তী গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং এমআরএনএ প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করা সম্ভব। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, উৎপাদন এবং আইনি অনুমোদন শেষ করে তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আপাতত আক্রান্ত অঞ্চলে সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় ১২ টন পিপিই ও জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে কিছু পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনও কঙ্গোতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

নতুন করে ইবোলার এই বিস্তারে নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ব সম্প্রদায়। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বাহরাইন ইতিমধ্যেই কঙ্গো, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদান থেকে আসা বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশ ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে। রুয়ান্ডা কঙ্গোর সাথে তাদের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও গত ২১ দিনের মধ্যে এসব দেশ ভ্রমণ করা অ-মার্কিন নাগরিকদের প্রবেশে ৩০ দিনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশও তাদের বিমানবন্দরগুলোতে থার্মাল স্ক্রিনিং ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা জোরদার করছে। করোনা মহামারির সময় যেভাবে রেকর্ড গতিতে ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছিল, ইবোলার ক্ষেত্রে সেই গতি কেন দেখা যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কুপ্পালি এক তিক্ত সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "কোভিড-১৯ ধনী দেশগুলোকে আঘাত করেছিল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির করে দিয়েছিল, তাই অভূতপূর্ব গতিতে তহবিল ও রাজনৈতিক মনোযোগ এসেছিল। কিন্তু আফ্রিকার মহামারিগুলো ঐতিহাসিকভাবে কখনোই ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে সেই স্তরের অর্থায়ন বা মনোযোগ পায় না, যতক্ষণ না তা উন্নত বিশ্বের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।"

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রাদুর্ভাব আবারও প্রমাণ করলো যে, শুধু আফ্রিকার স্বার্থে নয়, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই মহামারির পূর্বপ্রস্তুতি এবং ভ্যাকসিন গবেষণায় সমতা ও টেকসই বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন