নরওয়ের মডেলে গ্যাস নীতি ঘোষণার পর তোলপাড় অস্ট্রেলিয়া
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ২১:১৩
অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস খাত থেকে সাধারণ জনগণের জন্য আরও বেশি মুনাফা নিশ্চিত করতে নরওয়ের আদলে এক নজিরবিহীন ‘হস্তক্ষেপমূলক’ গ্যাস নীতি ঘোষণা করেছেন দেশটির ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘ওয়ান নেশন’-এর প্রধান পলিন হ্যানসন। তাঁর এই প্রস্তাব অনুযায়ী, সমুদ্রে নতুন গ্যাস প্রকল্পের ৩০ শতাংশ মালিকানা বা ইকুইটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। তবে এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে দেশটির বর্তমান সরকার, বিরোধী জোট এবং ব্যবসায়ী মহল।
বিরোধী লিবারেল কোয়ালিশন ওয়ান নেশনের এই নীতিকে সমাজতান্ত্রিক ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজের নীতির সাথে তুলনা করে এটিকে "ভেনিজুয়েলা থেকে ধার করা নীতি" বলে আখ্যা দিয়েছে।
অ্যাডিলেডে আয়োজিত একটি প্রধান গ্যাস শিল্প
সম্মেলনে পলিন হ্যানসন তাঁর এই নতুন নীতি বিশদভাবে তুলে ধরেন। সম্প্রতি ‘ফারার’ উপনির্বাচনে ওয়ান নেশনের ঐতিহাসিক
জয়ের পর থেকেই এই নীতির ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছিল। হ্যানসন বলেন, অস্ট্রেলিয়ার তেল ও গ্যাস
খাত থেকে রাষ্ট্র যে নামমাত্র লভ্যাংশ পায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ "যৌক্তিকভাবেই
অসন্তুষ্ট" এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ যখন পেট্রোলিয়াম
রিসোর্স রেন্ট ট্যাক্স বাতিল করে ২৫ শতাংশ সরাসরি রপ্তানি শুল্ক বা কর বসানোর দাবি
তুলছে, হ্যানসন সেই ২৫% রপ্তানি করের প্রস্তাবকে “অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ” বলে প্রত্যাখ্যান
করেছেন। এর পরিবর্তে তিনি বর্তমান ট্যাক্স ব্যবস্থাকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়ে তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত
করার প্রস্তাব করেন এবং নতুন প্রকল্পের জন্য একটি রয়্যালটি ব্যবস্থা চালুর কথা বলেন।
নরওয়ের সফল ‘সোভেরেন ওয়েলথ ফান্ড’ বা রাষ্ট্রীয় তহবিলের
মডেলে তৈরি হ্যানসনের এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে— গভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের
খরচের ৩০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি বা রিবেট দেবে। এর বিনিময়ে ওই প্রকল্পের সর্বোচ্চ ৩০
শতাংশ মালিকানা বা শেয়ার চলে যাবে সরকারের হাতে। এই ব্যবস্থার ফলে যেমন মুনাফার বড়
অংশ সাধারণ মানুষ পাবে, তেমনি অনুসন্ধানের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ঝুঁকিও রাষ্ট্রকে বহন
করতে হবে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ওয়ান নেশনের মাত্র
দুটি আসন থাকলেও সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দলটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। ফলে তাদের
এই নতুন নীতি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হ্যানসনের এই বক্তব্যের আগে স্কাই নিউজকে
দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিবারেল পার্টির শীর্ষ নেতা জেমস প্যাটারসন সরকারের গ্যাস কোম্পানি
মালিকানার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, "এই নীতি অস্ট্রেলিয়ার নয়, বরং ভেনিজুয়েলা
এবং হুগো চ্যাভেজের থেকে ধার করা। অস্ট্রেলিয়াবাসী আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আরও
ভালো রিটার্ন চায়—এটি একটি যৌক্তিক নীতি এবং কর ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে, কিন্তু
আমাদের তেল ও গ্যাস শিল্পকে রাষ্ট্রীয়করণ করা কোনো সমাধান হতে পারে না।"
অবশ্য হ্যানসন এই প্রস্তাবকে "সমাজতান্ত্রিক
দখলদারিত্ব" হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, এই নতুন রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থাটি
অংশীদার গ্যাস কোম্পানির দৈনন্দিন পরিচালনায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। গ্যাস শিল্পের
শীর্ষ সংগঠন ‘অস্ট্রেলিয়ান
এনার্জি প্রডিউসার্স’ গ্যাস খাতের প্রতি হ্যানসনের সমর্থনকে স্বাগত জানালেও তাদের বর্তমান
কর ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বন করেছে। অন্যদিকে ‘মিনারেলস কাউন্সিল অফ অস্ট্রেলিয়া’ এই
ধরণের পরিপক্ক বা ‘ম্যাচিউর’ শিল্পে সরকারের শেয়ার নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সম্পদ মন্ত্রী ম্যাডেলিন
কিং-ও হ্যানসনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "গ্যাস শিল্পে বিনিয়োগ করার
উপযুক্ত সময় আয়ারল্যান্ড ৩০ বা ৪০ বছর আগেই পার করে এসেছে। এখন আর অতীতে ফিরে যাওয়ার
সুযোগ নেই। তাছাড়া দেশের বহু মানুষই চান না যে সরকার এই মুহূর্তে গ্যাস খাতে বিপুল
পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করুক।"
একই সম্মেলনে বিরোধী দলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস
টেইলর পরিবেশ সুরক্ষার ‘নেট জিরো’ কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা বাতিলের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত
করেন। তিনি দেশে "জ্বালানি প্রাচুর্য" নিশ্চিত করতে আরও বেশি খনন ও উত্তোলনের
ওপর জোর দেন এবং ২৫% রপ্তানি করের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গ্যাস শিল্পের নির্বাহীদের সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

