Logo

আন্তর্জাতিক

ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ২১:১৫

ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক

উত্তর ইউরোপ সফরের অংশ হিসেবে নরওয়ে সফরে গিয়ে এক নরওয়েজিয়ান নারী সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ওই সাংবাদিকের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন এড়াতে মোদীর সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে হেঁটে চলে যাওয়া এবং পরবর্তীতে তাঁর এক শীর্ষ কূটনীতিকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেশটিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নাজুক পরিস্থিতিকে আবারও বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস -এর প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান বর্তমানে ১৫৭তম, যা গত বছরের (১৫১তম) চেয়ে আরও ছয় ধাপ নিচে নেমে গেছে।

গত সোমবার নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে নরেন্দ্র মোদী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানান যে, তিনি একটি "প্রেস মিট" বা সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। তবে সেখানে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এ সময় নরওয়ের দৈনিক দাগসাভিসেন’ -এর সাংবাদিক হেলে লিং সভেনসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে প্রশ্ন করেন, "প্রধানমন্ত্রী মোদী, আপনি বিশ্বের অন্যতম মুক্ত গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর কেন দিচ্ছেন না?" কিন্তু মোদী কোনো জবাব না দিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

নরেন্দ্র মোদী প্রশ্নটি শুনতে পেয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাংবাদিক সভেনসেন মোদীর পিছু পিছু কক্ষের বাইরে গিয়ে আবারও প্রশ্ন করেন, "আপনি কি আমাদের সরকারের বিশ্বাস পাওয়ার যোগ্য?" সেখানেও তিনি কোনো উত্তর পাননি।

পরে সভেনসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেন, "নরওয়েতে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা এলে গণমাধ্যম সাধারণত দু-একটি প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। কিন্তু মোদীর ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ভারতে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা আমি জানি। আমি যদি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশে বসেও প্রশ্ন করার সাহস না দেখাই, তবে কে দেখাবে?"

একই দিন বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় সচিব সিবি জর্জের অন্য একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক সভেনসেন ভারতে ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেন, "এ অবস্থায় নরওয়ে কেন ভারতকে বিশ্বাস করবে?" এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় কূটনীতিক সিবি জর্জ মূল উত্তর এড়িয়ে ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কথা বলা শুরু করেন।

তিনি বলেন, ভারতে দাবার আবিষ্কার হয়েছে, শূন্য (০) ধারণার উৎপত্তি হয়েছে এবং করোনা মহামারির সময় ভারত বিশ্বকে কোটি কোটি ভ্যাকসিন দিয়েছে। একপর্যায়ে সাংবাদিক সভেনসেন তাকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি জানতে চান, তিনি কেন মানবাধিকারের মূল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সিবি জর্জ উচ্চস্বরে বলেন, "ভারত একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ। আমরা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ, কিন্তু বিশ্বের মোট সমস্যার ছয় ভাগের এক ভাগ কিন্তু আমাদের দেশে নয়। আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকার ও নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।"

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর গত ১২ বছরের শাসননামলে ভারতের মাটিতে নরেন্দ্র মোদী একটিও উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলন করেননি। বিদেশ সফরেও তিনি প্রশ্ন নেওয়া এড়াতে পছন্দ করেন। কেবল ২০২৩ সালে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক সাবরিনা সিদ্দিকী ভারতের সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই প্রশ্নের পর মোদী দাবি করেছিলেন, "গণতন্ত্র ভারতের ডিএনএ-তে রয়েছে।"

তবে ওই ঘটনার পর মুসলিম বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক সাবরিনাকে মোদীর দল বিজেপির সমর্থকদের কাছ থেকে তীব্র অনলাইন হয়রানি ও ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয়েছিল। নরওয়ের সাংবাদিক সভেনসেনও বর্তমান ঘটনার পর ব্যাপক অনলাইল ট্রোলিংয়ের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

মোদীর এই সংবাদ সম্মেলন এড়ানোর সংস্কৃতির সমালোচনা করে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী এক্স-এ লিখেছেন, "যার কিছু লুকানোর নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই। বিশ্ব যখন দেখে একজন প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি প্রশ্ন দেখেই আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন, তখন ভারতের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?"

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস -এর এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার আল জাজিরাকে বলেন, ভারতে গত এক দশকে সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্ন করার জায়গাটি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে এসেছে। এটি কেবল কেন্দ্রের কোনো একক দল নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের দলগুলোও স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ভারতে এখন সাংবাদিকদের সরাসরি গ্রেফতারের চেয়েও ট্যাক্স অফিস, ফাইন্যান্সিয়াল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে গণমাধ্যমকে চাপে রাখার এক অদৃশ্য প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট ব্লক করা এবং সাংবাদিকদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে একটি ভয়ের পরিবেশ’ ও সেলফ-সেন্সরশিপ’ (স্বেচ্ছায় মুখ বন্ধ রাখা) তৈরি করা হচ্ছে।

ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই এই পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, একসময় ভারতে সংবাদ সম্মেলনে নেতা বা কূটনীতিকদের কঠিন প্রশ্ন করাই ছিল নিয়ম। আর এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একজন বিদেশি সাংবাদিক সাধারণ একটি প্রশ্ন করলেই তা বিশাল ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায় এবং ওই সাংবাদিকের এজেন্ডা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়!

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন