ইবোলা আতঙ্ক
আফ্রিকার ৩ দেশের ওপর মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ২১:১০
ইবোলা
কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি), উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবের জেরে দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দাবি—এই নিষেধাজ্ঞা সংকট সমাধানের বদলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত রোববার এই ইবোলা পরিস্থিতিকে 'আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়। এর মধ্যেই ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) দক্ষিণ কিভু প্রদেশে নতুন করে এক ব্যক্তির শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে, যা বর্তমানে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী—বিগত
২১ দিনের মধ্যে এই তিনটি দেশের যেকোনো একটিতে ভ্রমণ করেছেন এমন মার্কিন পাসপোর্টবিহীন
কোনো নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাপক
বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। কঙ্গোর জাতীয় পুরুষ ফুটবল দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সূচি ব্যাহত
হওয়ার পাশাপাশি গত বুধবার কঙ্গো থেকে আসা এক যাত্রী ফ্লাইটে থাকায় ডেট্রয়েটগামী একটি
বিমানকে বাধ্য হয়ে কানাডায় জরুরি অবতরণ করাতে হয়। আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল
অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছে, প্রতিটি
দেশেরই নিজস্ব নাগরিকদের সুরক্ষার অধিকার রয়েছে, তবে ঢালাও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা সীমান্ত
বন্ধ করে দেওয়া মহামারির কোনো সমাধান হতে পারে না।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, "এই
ধরনের নিষেধাজ্ঞা মানুষের মনে ভীতি তৈরি করে, অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে এবং আক্রান্ত
দেশগুলোর স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এছাড়াও এটি মানবিক ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমকে
বাধাগ্রস্ত করে। মানুষ তখন আইনি পথ ছেড়ে অনিয়ন্ত্রিত ও অনানুষ্ঠানিক রুট ব্যবহার করতে
শুরু করে, যা সংক্রমণ কমানোর বদলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।"
এবারের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে
ইবোলার 'বুন্দিবুগিও' স্ট্রেন, যার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন
বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই। আফ্রিকা সিডিসি একে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য
গবেষণার একটি 'গভীর কাঠামোগত বৈষম্য' হিসেবে উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির
মতে, বুন্দিবুগিও ইবোলা ভাইরাসটি প্রায় দুই দশক আগে শনাক্ত হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো
সুনির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা থেরাপিউটিকস তৈরি করা হয়নি। আফ্রিকা সিডিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে—যদি
এই রোগটি বিশ্বের কোনো ধনী দেশে হানা দিত বা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত,
তবে এতদিনে এর প্রতিষেধক ওষুধ ও ভ্যাকসিন বাজারে চলে আসত।
আফ্রিকা সিডিসির এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে
'আমরেফ হেলথ আফ্রিকা' -র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. গিথিনজি গিতাহি বলেন,
"ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ভাইরাস প্রতিরোধ করে না, বরং এটি বিশ্বজনীন সংহতিকে থমকে দেয়।
মহামারি থেকে বাঁচার দ্রুততম উপায় হলো ভাইরাসের উৎসমূলে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, আক্রান্তদের
বিচ্ছিন্ন করা নয়। আফ্রিকার এখন অংশীদারিত্ব প্রয়োজন, শাস্তি নয়।" যুক্তরাষ্ট্রের
এই পদক্ষেপকে 'বাড়াবাড়ি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন উগান্ডার তথ্যমন্ত্রী ক্রিস ব্যারিওমুনসি।
তিনি বলেন, "আমরা বহু বছর ধরে ইবোলা এবং অন্যান্য মহামারির সফল মোকাবিলা করেছি।
এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত কঙ্গোতে ইবোলার কারণে ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায়
৬০০ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় ২
জন আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই কঙ্গোর ইতুরি এবং
উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দা। এদিকে, রুয়ান্ডা সমর্থিত 'এম২৩' বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে
থাকা উত্তর কিভুর রাজধানী গোমা শহরে নতুন করে ইবোলা রোগী শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ চরম আকার
ধারণ করেছে। ত্রাণ সামগ্রী ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধার্থে গোমা
বিমানবন্দরটি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার জন্য জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে। ইবোলার এই ভয়াবহতা
ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের 'ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন'-এর
গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই প্রাদুর্ভাবের আকার ও ভয়াবহতা অনুমানের চেয়েও
ব্যাপক হতে পারে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

