Logo

আন্তর্জাতিক

কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে আলবার্টায় গণভোট

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ২১:১৩

কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে আলবার্টায় গণভোট

আলবার্টার প্রিমিয়ার দানিয়েল স্মিথ

কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ তেল ও খনিজ সমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টা কানাডা থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে, নাকি ফেডারেশনের অংশ হিসেবেই থেকে যাবে—তা নির্ধারণে আগামী ১৯ অক্টোবর একটি ঐতিহাসিক গণভোটের ডাক দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এই প্রথম কানাডার জাতীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলো।

এক টেলিভিশন ভাষণে আলবার্টার প্রিমিয়ার দানিয়েল স্মিথ এই গণভোটের ঘোষণা দেন। চলতি বছরের শুরুতে প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে ৩ লাখেরও বেশি নাগরিকের স্বাক্ষর সংবলিত একটি পিটিশন জমা পড়ে। অন্যদিকে, কানাডার সঙ্গে যুক্ত থাকার পক্ষে জমা পড়ে আরও ৪ লাখ নাগরিকের স্বাক্ষর। এই বিপুল জনআকাঙ্ক্ষা এবং আইনি জটিলতার অবসান ঘটাতেই প্রাদেশিক সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, এই গণভোটের পথটি খুব সহজ ছিল না। সম্প্রতি আলবার্টার একটি আদালত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গণভোটের দাবি সম্বলিত পিটিশনটি বাতিল করে দেন। আদিবাসী 'ফার্স্ট নেশনস' গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় তাদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়নি, যা তাদের অধিকারের লঙ্ঘন। আদালতের এই রায়ের ফলে গণভোটের পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি গোলকধাঁধায় আটকে যায়। তবে আদালতের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন প্রিমিয়ার দানিয়েল স্মিথ। তিনি তার ভাষণে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একজন একক বিচারকের আইনি ভুলের কারণে আমি লাখ লাখ আলবার্টাবাসীর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হতে দেব না। আলবার্টার ভবিষ্যৎ আলবার্টাবাসীরাই নির্ধারণ করবে, কোনো আদালত নয়।

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে হাজার হাজার মানুষের মতামত প্রকাশে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আলবার্টার কি কানাডার একটি প্রদেশ হিসেবে থাকা উচিত, নাকি আলবার্টা সরকার কানাডিয়ান সংবিধান অনুযায়ী আলাদা হওয়ার জন্য একটি চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে? তবে স্মিথ এটিও পরিষ্কার করেছেন যে, তিনি নিজে এবং তার দল আলবার্টার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষেই ভোট দেবেন। কিন্তু জনগণের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান জানাতেই এই ভোট আয়োজন করা হচ্ছে।

প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বাসস্থান এই আলবার্টা প্রদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তবে ওটাওয়ার (কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার) বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। আলবার্টাবাসীদের বড় অংশের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার দেশের পরিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এই প্রদেশের মূল চালিকাশক্তি তেল ও গ্যাস শিল্পের বিকাশে বারবার বাধা সৃষ্টি করছে। তাছাড়া, আলবার্টার অর্জিত রাজস্বের একটি বড় অংশ দেশের অন্যান্য অনুন্নত অঞ্চলের পেছনে ব্যয় করা হয়, কিন্তু বিনিময়ে প্রদেশটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সবসময় অবহেলিত থাকে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম কট্টর সমর্থক ও আইনজীবী জেফ্রি রথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা বাকি কানাডার চেয়ে আমেরিকার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের বেশি মিল খুঁজে পাই। আমি নিজেকে আর কানাডিয়ান মনে করি না।"

কানাডায় বিচ্ছিন্নতাবাদের ইতিহাস এবারই প্রথম নয়। এর আগে ফরাসিভাষী প্রদেশ কিউবেক দুইবার (১৯৮০ এবং ১৯৯৫ সালে) স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করেছিল। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালের ভোটে মাত্র ৫০.৫৮% বনাম ৪৯.২২% ভোটের ব্যবধানে অত্যন্ত অল্পের জন্য কিউবেক কানাডার সঙ্গে থেকে যায়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই কানাডা সরকার বিচ্ছেদের জন্য 'ক্লারিটি অ্যাক্ট' নামক একটি ২৬ বছর পুরনো আইন তৈরি করে। চলতি মে মাসের শুরুতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টার এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো বিচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে অবশ্যই ক্লারিটি অ্যাক্টের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

এই আইনের অধীনে—ভোটে একটি 'সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা' থাকতে হবে, গণভোটের প্রশ্নের ভাষা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং কেন্দ্রীয় হাউজ অব কমন্স (সংসদ) পুরো বিষয়টির তদারকি করবে। ফলে অক্টোবরের ভোটে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জিতলেও, ওটাওয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের আলোচনা হবে অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল।

আলবার্টার এই ঘোষণার পর কানাডার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক এক বিবৃতিতে বলেন, "লিবারেল সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আলবার্টাবাসীসহ সমস্ত কানাডিয়ানের স্বার্থ তখনই রক্ষা পাবে যখন আমরা একসঙ্গে কাজ করব। আমরা আলবার্টার মানুষের কল্যাণে একটি শক্তিশালী কানাডা গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" অন্যদিকে, ফেডারেল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিভ্রে—যিনি নিজে আলবার্টার সন্তান, তিনিও দেশের অখণ্ডতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, "আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ দেশের পক্ষে এবং আশার আলো নিয়ে এই দেশকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে আমরা প্রতিদিন কাজ করে যাব।"

কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইতোমধ্যে আলবার্টার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে একটি বহুল প্রতীক্ষিত তেল পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে স্মিথের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। চলতি মাসের শুরুতেই দুই নেতা একটি জলবায়ু ও জ্বালানি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে আগামী বছরই পাইপলাইনের কাজ শুরু হতে পারে। তবে এই অর্থনৈতিক স্বস্তির মাঝেও রাজনৈতিক স্বাধীনতার এই গণভোট কানাডার ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন