Logo

আন্তর্জাতিক

মার্কিন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা আঘাত

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ২১:২৪

মার্কিন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা আঘাত

# চীনের কড়া বার্তা

# অস্ট্রেলিয়ার গভীর উদ্বেগ

# ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ৬ দেশের নিষেধাজ্ঞা

দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর পরই মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম রূপ নিয়েছে। মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দিতে বুধবার সকাল থেকে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত আমেরিকার বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক ও নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে তেহরান। 

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ‘আইআরজিসি’ এবং খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দফতর এই যৌথ অভিযানের দায় স্বীকার করে জানিয়েছে যে ওয়াশিংটন তাদের আক্রমণ বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আরও বিধ্বংসী ও চূড়ান্ত পাল্টা আঘাত হানা হবে।

আইআরজিসি মহাকাশ শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে জর্ডানের একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে তাদের ছোড়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা ওই ঘাঁটির প্রধান চারটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা, যার মধ্যে আমেরিকার অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রয়েছে।

আইআরজিসি স্পষ্ট করেছে যে এই আক্রমণটি ছিল আমেরিকার পূর্ববর্তী বিমান হামলার বিরুদ্ধে নেওয়া তাদের এক বৃহৎ পাল্টা অভিযানের শেষ ধাপ, যার আওতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মোট ২১টি পয়েন্টে আঘাত করা হয়েছে এবং ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একটি মার্কিন ‘এমকিউ-৯’ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে।

এই পাল্টা অভিযানের অংশ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সামরিক ঘাঁটিতেও একযোগে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। আইআরজিসি এবং খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে নিজেদের একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে উছিলা বানিয়ে দক্ষিণ ইরানের জাস্ক, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে আমেরিকার চালানো বিমান হামলার প্রতিবাদেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 

মার্কিন বাহিনীর বোমাবর্ষণে সিরিকের বেমানি এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার পর পরই ইরান এই পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, যার ফলে বাহরাইনজুড়ে আকস্মিক সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয় এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাধারণ জনগণকে নিকটতম নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

একই সময়ে কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘আলি আল সালেম’ ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেও পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই বিমান হামলার মুখে কুয়েতের সেনাবাহিনী এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তাদের জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আকাশপথে ধেয়ে আসা শত্রুপক্ষের বৈরী লক্ষ্যবস্তুগুলো প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। 

কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দেশের নাগরিকদের সার্বিক সুরক্ষাসংক্রান্ত সকল নির্দেশনাবলী কঠোরভাবে মেনে চলার পাশাপাশি যেকোনো বিভ্রান্তি এড়াতে শুধুমাত্র অনুমোদিত সরকারি সূত্র থেকে তথ্য নেওয়ার বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাত ও উত্তেজনা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা ‘সেন্টকম’ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। মার্কিন সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা দক্ষিণ ইরানে তাদের ভাষায় একটি ‘আত্মরক্ষামূলক’ বিমান হামলা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। তবে তেহরান থেকে আল জাজিরার বিশেষ সংবাদদাতা মোহাম্মদ ভাল জানিয়েছেন যে ইরানের সামরিক কমান্ডের বার্তাগুলো অত্যন্ত কড়া ভাষার ছিল এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার এককভাবে ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে বলে তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

কড়া বার্তা চীনের: ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নতুন করে চালানো বিমান হামলার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানকে অনতিবিলম্বে উত্তেজনা বৃদ্ধি বন্ধ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। বেইজিং দুই দেশের মধ্যকার এই বিপজ্জনক সামরিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। 

গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বিবদমান উভয় পক্ষকে সম্পূর্ণ শান্ত থাকার এবং সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের তাগিদ দিয়েছেন। লিন জিয়ান দুই পরাশক্তিকে উত্তেজনা বাড়ায় এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন।

এই নতুন সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে মূলত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এক ঘোষণার পর। সেন্টকম জানায় যে সোমবার তাদের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জবাবে মঙ্গলবার মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করে। এর জবাবে বুধবার ভোরের দিকে ইরানের সামরিক সদর দপ্তর থেকে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।

অস্ট্রেলিয়ার গভীর উদ্বেগ: ইরানের ওপর মার্কিন বিমান বাহিনীর নতুন করে চালানো বোমাবর্ষণের পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র আকার ধারণ করা সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ।

গতকাল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার সরকারপ্রধানের এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

গণমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অ্যালবানিজ চলমান এই যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে নিজের তীব্র শঙ্কার কথা জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও বৃদ্ধি পেলে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আছড়ে পড়বে। 

অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের অনুলিপি অনুযায়ী তিনি স্পষ্ট করেছেন যে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যে বিশাল ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও বেশি অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ৬ দেশের নিষেধাজ্ঞা: অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ছড়ানোর দায়ে এবার ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারীদের নেটওয়ার্কের ওপর চড়াও হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। এই সহিংসতায় অর্থায়ন, সহায়তা ও সরাসরি হামলা পরিচালনাকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার একযোগে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স এবং নরওয়ে।

এর আগে গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফলে মোট ছয়টি দেশ এখন পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত নেটওয়ার্ক, অর্থায়নকারী ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চরম সহিংসতার জন্য দায়ী কট্টর বসতি স্থাপনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনাই আমাদের লক্ষ্য। তারা ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন এই সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, তার দেশ ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ, কয়েকজন বসতি নেতা এবং ২১ জন সহিংস বসতি স্থাপনকারীকে ফ্রান্সে প্রবেশে নিষিদ্ধ করেছে।  

যুক্তরাজ্য লক্ষ্য করেছে মূলত অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে। তারা এমন একটি নির্মাণ কোম্পানিকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে, যাদের সম্পদ ফিলিস্তিনি সম্পত্তি ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডা আলাদা একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও তার মালিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন