Logo

আন্তর্জাতিক

খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে জনসমুদ্র তেহরান

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০:৪৯

খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে জনসমুদ্র তেহরান

# তিন দিনে দুই কোটি মানুষের সমাগমের আশা

# ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান ধ্বনিত

# নিরাপত্তার কারণে অনুপস্থিত ছেলে মোজতবা

# শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহ বিরতি

# সহায়তা বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের উদ্দেশে প্রতিরোধের বার্তা দিতে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহিদ আলি খামেনির প্রায় সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠনের সূচনায় তেহরানে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রক্তিম পতাকা হাতে শোকাহত মানুষ রাজধানী তেহরানের ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হন।

ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে হাজারো মানুষ সারিতে দাঁড়িয়েছেন। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শোক ও শেষশ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছেন ইরানিরা। 

এর আগে গতকাল শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হয়। টানা সাত দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল তেহরানে বিদেশি নেতাদের বেশির ভাগই খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের প্রয়াত কয়েকজন সদস্যের প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন। ইরানের কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের শাসনক্ষমতায় থাকা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে আগামী তিন দিনে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে তারা আশা করছে।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই বহু মানুষ ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। আজ সকাল নাগাদ সেটা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। ছয়টা থেকে জনসাধারণের জন্য অনুষ্ঠানস্থলের মূল ফটক খুলে দেওয়া হয়েছে। শ্রদ্ধা জানাতে এসে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ানো সোমায়ি হামেদি নামের এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে চাই। তাই এভাবে অপেক্ষা করাটা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক কিংবা কঠিন কিছু নয়।’

বিপুল জনসমাগমের এ আয়োজন ঘিরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ইরান সরকার। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আকাশপথ বন্ধ রাখার কথাও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পূর্বসুরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় জনসমাগম হতে চলেছে। খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

নিরাপত্তার কারণে খামেনির ছেলে ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী সোমবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকযাত্রা ইরানের দক্ষিণে কোম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। চলবে মঙ্গলবারও। বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ পৌঁছাবে। সেখান থেকে নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের অংশগ্রহণে শোকযাত্রা হবে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তাঁর প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন।

সবশেষে খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। গতকাল শুক্রবার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজারে খামেনির দাফন সম্পন্ন হবে। মাশহাদ তাঁর জন্মস্থান। নিরাপত্তার কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে গত মার্চ মাসে দাফন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই দিনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরু হয়েছিল। আগ্রাসনের ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। গত ১৭ জুন দেশ দুটি একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। এখন তারা কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ শুক্রবার ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

তেহরানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রমুখ। আরও ছিলেন ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা।

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া আলি খামেনি পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার নীতি অনুসরণ করেছিলেন এবং দেশের অভ্যন্তরে ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরাইলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রাণ হারান।

খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির এখনো কোনো প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখা যায়নি। তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তবে যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার বিদেশি অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান এবং তারা খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কমপ্লেক্সটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

তেহরানে আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তাই শোকাহতদের স্বস্তি দিতে পানি ছিটানো হয়। নারী ও পুরুষকে পৃথকভাবে রাখা হয় এবং হাজারো মানুষ বিশাল কমপ্লেক্সটি পূর্ণ করে তোলেন। এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, সামনের মঞ্চে খামেনি ও তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে।

অনুষ্ঠানস্থলে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান ধ্বনিত হয়।

শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহ বিরতি: এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রেখেছে।

গতকাল শুক্রবার দক্ষিণ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘আমেরিকা ২৫০’ উদ্যাপনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।

ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রশংসা করে বলেন, দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরা ইতিহাসের অতলে হারিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা একদিনেই ভেনেজুয়েলাকে পরাজিত করেছি এবং ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করেছি। তারা এখন সমঝোতা করতে মরিয়া। আমরা ভালো মানুষ বলেই তাদের নেতার শেষকৃত্যের জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি।

সহায়তা বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের: ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা নিয়ে  পর্দার আড়ালে গত পাঁচ দিনে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। খামেনির জানাজার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশকে অংশ না নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ এবং নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে মার্কিন প্রশাসন।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এই প্রচারণা সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমন্বয় করা হয়। এতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা জড়িত ছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, কোনো দেশ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিনিধিদল পাঠালে তাদের উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে বা আটকে দেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার হুমকিও দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ জুন রুবিও একটি গোপন নির্দেশনা জারি করে বিশ্বের সব মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনকে নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে তারা স্বাগতিক দেশের কর্মকর্তাদের বোঝানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের কূটনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করে। নির্দেশনায় বলা হয়, ইরানের জানাজায় অংশগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়তে পারে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন