মার্কিন বিচার বিভাগের সমনের
বিরুদ্ধে আদালতে নিউ ইয়র্ক টাইমস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ২০:২৮
কাতারের উপহার দেওয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মার্কিন সাংবাদিকদের ওপর দেশটির বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিন) যে সমন বা সাবপোনা জারি করেছিল, তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছে বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং গোপন
সূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করার এই সরকারি প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বুধবার নিউইয়র্কের
একটি আদালতে সমন বাতিলের আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি জেনারেল কাউন্সেল ডেভিড ম্যাকক্রো এক বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের আইনি আবেদনে আমরা স্পষ্ট করেছি যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং টাইমস-এর সাহসী সাংবাদিকতাকে স্তব্ধ করতেই এই সমন পাঠানো হয়েছে। এটি আমাদের সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। প্রশাসনের যেকোনো কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন লেখার অধিকার রক্ষা এবং জনস্বার্থের খবর প্রকাশের স্বার্থে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।"
টাইমস-এর সাংবাদিকদের চলতি সপ্তাহে ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সামনে
হাজির হতে বলা হয়েছিল, যার মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকের বাড়িতে গিয়ে সমন পৌঁছে দেয় মার্কিন
প্রশাসন। ফ্রি প্রেস বা মুক্ত গণমাধ্যম কর্মীরা এই ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর
এক নজিরবিহীন সরকারি ব্ল্যাকমেইল ও দমনপীড়ন বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
মূল ঘটনার সূত্রপাত কাতার সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপহার দেওয়া নতুন একটি বিমানকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প প্রশাসন বিমানটির আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পেছনে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে সম্প্রতি এটি চালু করে। তবে গত সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন দেশে ফেরেন, তখন তিনি নতুন বিমানটির বদলে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান মডেলের একটি বিমান ব্যবহার করেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে গোপন
সূত্রের বরাত দিয়ে জানায় যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা 'সিক্রেট সার্ভিস'-এর বিশেষ অনুরোধে
বিমান পরিবর্তন করা হয়েছিল। কারণ, নতুন বিমানটিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার
মতো কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উন্নত নিরাপত্তা ফিচারের ঘাটতি রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নিরাপত্তা সংকটের কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
এদিকে মার্কিন বিচার বিভাগ তাদের এই বিতর্কিত
পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে জানিয়েছে, সাংবাদিকদের হেনস্থা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়,
বরং যারা জাতীয় নিরাপত্তার তথ্য বা ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন বাইরে ফাঁস (লিক) করে দিচ্ছে,
তাদের খুঁজে বের করতেই এই তদন্ত। বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, "আমরা সংবাদমাধ্যমের
ভূমিকাকে শ্রদ্ধা করি, তবে দেশের গোপন তথ্য সুরক্ষার দায়িত্বও আমাদের। যারা এই তথ্য
ফাঁসের সাথে জড়িত, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।"
চলতি বছরের শুরুর দিকেই ওয়াশিংটন পোস্টের
এক নারী সাংবাদিকের বাড়িতে এফবিআই তল্লাশি চালিয়ে তার সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করেছিল।
তার রেশ কাটতে না কাটতেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওপর এই সমন জারির ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের
সংবাদমাধ্যম ও ভিন্নমতের ওপর দমনপীড়নের এক চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে
বিভিন্ন সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ফোনের রেকর্ড পরীক্ষার মতো ঘটনা ঘটলেও, সরাসরি জুরির
সামনে হাজির হয়ে খবরের মূল উৎস বা সোর্সের নাম প্রকাশ করতে বাধ্য করার মতো ঘটনা মার্কিন
ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
মুক্ত গণমাধ্যম কর্মীরা মনে করছেন, এই
আইনি লড়াইয়ের রায় আমেরিকার সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা
রাখবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

