Logo

আন্তর্জাতিক

সামরিক নেতৃত্বের সাথে বিরোধে

ইউক্রেনে তীব্র রাজনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ২০:৫০

ইউক্রেনে তীব্র রাজনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভ

ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের জেরে দেশটির জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরভকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইউক্রেনজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং যুদ্ধের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির পর এই দ্বিতীয়বারের মতো দেশটির সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।

রাজধানী কিয়েভে সফররত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন যে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দেশের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। সংস্কারপন্থী ও আধুনিকমনস্ক নেতা হিসেবে পরিচিত ফেদোরভের সাথে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কির তীব্র "মতবিরোধ ও চ্যালেঞ্জিং সংলাপ" চলছিল।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, আমি খুব করে চেয়েছিলাম তাদের মধ্যে একতা বজায় থাকুক। কিন্তু কোনো পক্ষই সমঝোতায় আসতে পারেনি। এই সমস্যার দায় কিছুটা আমারও। তবে পরিস্থিতি যখন এমন দাঁড়ায়, তখন আপনাকে যেকোনো একটা পক্ষ বেছে নিতেই হয়। ফেদোরভকে সরিয়ে জেলেনস্কি দেশটির নিরাপত্তা সংস্থার অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান ইয়েভহেনই খমারাকে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এবং পার্লামেন্টে তার নাম অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছেন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের নাগরিক সমাজ ও পশ্চিমা মিত্রদের গভীরভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। বৃহস্পতিবার কিয়েভে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বাইরে এক হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে ফেদোরভের পক্ষে স্লোগান দেন। সাধারণ মানুষের হাতে "কেন এই সিদ্ধান্ত?" এবং "আপনার কি মাথা ঠিক আছে?" লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা এ সময় সেনাপ্রধান সিরস্কির পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল স্লোগান দেন। ইউক্রেনের বিশিষ্ট নাগরিকরা অভিযোগ করেছেন, ফেদোরভ তরুণ, প্রযুক্তিপ্রেমী ও জনপ্রিয় হওয়ায় জেলেনস্কি তাকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছিলেন এবং সেই কারণেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালেও জেলেনস্কি তৎকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জেনারেল ভ্যালেরি জালুঝনিকে বরখাস্ত করে লন্ডনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

একই দিনে বিদায়ী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরভ এক পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে ইউক্রেনের সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। ফেদোরভ অভিযোগ করেন, সামরিক বাহিনী এখনো পুরোনো "সোভিয়েত আমলের নিয়মে" চলছে এবং তারা আধুনিক সামরিক সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন সামরিক ব্রিগেডকে ড্রোন বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে, তা তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং "আনুগত্যের" ওপর ভিত্তি করে ঠিক করা হয়। তিনি বলেন, এই ধরনের সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় আমরা রাশিয়ার মতো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জর্জরিত শত্রুকে পরাজিত করতে পারব না। ফেদোরভ আরও জানান, তিনি সেনাপ্রধান সিরস্কিকে পরিবর্তন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার জের ধরেই বুধবার তাঁকে পদচ্যুত করা হয়।

এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই কিয়েভ সফর করছেন যুক্তরাজ্যের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। আগামী সোমবার ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়ার আগে এটি তাঁর শেষ বিদায়ী সফর। এই সফরের সময় দুই নেতা কিয়েভের 'ওয়াল অব রিমেম্বারেন্স'-এ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং পরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ইউক্রেনের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'অর্ডার অব ফ্রিডম' প্রদান করেন। স্টারমার আবেগপ্লুত হয়ে জেলেনস্কিকে একটি ইউক্রেনীয় পতাকা উপহার দেন, যা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ আক্রমণের সময় থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে উড়ছিল। স্টারমার বলেন, "আমি রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে বিদায় নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থন কখনোই বদলাবে না।"

ইউক্রেনের রাজনীতিতে এই রদবদল কেবল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তার পুরো সরকারকে একটি "রিবুট" বা নতুন করে সাজানোর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্যাভরিডেনকোর পদত্যাগপত্রও পার্লামেন্ট গ্রহণ করেছে। তার জায়গায় দেশের জ্বালানি কোম্পানি নাফটোগাজের প্রধান সের্হি কোরেতস্কি নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন যখন রুশ তেল শোধনাগার এবং ক্রিমিয়ার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, ঠিক তখনই ভেতরের এই রাজনৈতিক কোন্দল ও রাজপথের বিক্ষোভ জেলেনস্কি সরকারকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল।

 

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন