মার্কিন হামলায় ইরানে নিহত ৩৮, আহত ৪ শতাধিক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ২০:৫১
ফাইল ছবি
# তেহরানের পাল্টা আঘাত
# হরমুজ প্রণালিতে আবারও অচলাবস্থা
# ফের আলোচনার আহ্বান চীন-পাকিস্তানের
# বাড়ছে তেলের দাম, উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতিতে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। টানা ষষ্ঠ দিনের মতো মার্কিন হামলার পর শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন করে হামলার দাবি করেছে তেহরান। একইসঙ্গে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২২ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন শিশু রয়েছে। আহতদের মধ্যে ২২ জন নারী এবং নয়জন ১৮ বছরের কম বয়সী।
বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা: মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে তারা শুক্রবার রাতেও একাধিক হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশ এবং নৌবাহিনী ও ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিভিন্ন স্থাপনায় নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করেই এসব হামলা হয়েছে।
তবে ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও একাধিক সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর খামিরে সেতুতে হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, চাবাহারের কাছে পাসাবান্দার এলাকায় এক বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন।
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি: পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিয়ার আল-তানফে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান কমান্ড সেন্টারেও হামলা চালানো হয়েছে, যা সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, ওমানের ঘান্নেম এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার এবং সালামেহ রকস এলাকায় একটি নৌ রাডার ধ্বংসেরও দাবি করেছে আইআরজিসি। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
হরমুজ প্রণালিতে আবারও অচলাবস্থা: নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তেহরান পুনরায় প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে বলে জানিয়েছে, আর ওয়াশিংটনও ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় অবরোধ কার্যকর করেছে।
রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
এদিকে, হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে হামলা বা নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির ঘটনায় ‘চুপ করে বসে থাকবেন না’। তবে একইসঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চান।
ফের আলোচনার আহ্বান চীন-পাকিস্তানের: চীনের সাংহাইয়ে বৈঠক শেষে চীন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বর্তমান পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়াং ই বলেন, গত জুনে হওয়া সমঝোতা যুদ্ধ অবসানের পথে একটি কঠিন অর্জন ছিল। শান্তি এখন হাতের নাগালে, তাই শেষ মুহূর্তে সেই সুযোগ হারানো উচিত নয়।
ইরানের কোথায় কোথায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরানের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন শহর, দক্ষিণ উপকূলের দ্বীপ ও মূল ভূখণ্ডের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে—আক্কালা, আহভাজ, বাম্পুর, বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, চাবাহার বন্দর, দাশত-ই আজাদেগান, দেহলোরান, ফারভার, হাজিয়াবাদ, হোভেইজেহ, ইরানশাহর বিমানবন্দর, ইসফাহান, জাস্ক, কাবুদারাহাং, খোন্দাব, কোনারাক, বন্দর-ই মাহশাহর, কেশম, সিরিক ও ভেসিয়ান।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, গত মে ও জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যেসব স্থানে হামলা চালিয়েছে তার মধ্যে বন্দর আব্বাস, বন্দর-ই লেঙ্গেহ, কং, কেশম দ্বীপ ও শহীদ রাহবার নৌঘাঁটির নাম রয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় জলসীমায় ৩০টির বেশি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত এবং সেগুলো ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাবলয় গঠন করেছে। এসব দ্বীপ ইরানকে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌবাহিনী মোতায়েনের জন্য অগ্রবর্তী অবস্থান প্রদান করে। পাশাপাশি, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহন করিডরের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায়ও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাড়ছে তেলের দাম, উদ্বেগ বিশ্ব অর্থনীতিতে: সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
এদিকে, তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। তার ভাষায়, ‘এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমরা চাই কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক।’
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

