Logo

আন্তর্জাতিক

শি জিনপিংয়ের নতুন ‘শুদ্ধি অভিযানে’ কাঁপছে চীন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ২০:৫১

শি জিনপিংয়ের নতুন ‘শুদ্ধি অভিযানে’ কাঁপছে চীন

চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পলিটব্যুরো’র প্রভাবশালী সদস্য ও জিনজিয়াং প্রদেশের সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান মা শিংরুই-কে দল থেকে বহিষ্কার করেছে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি)। এর মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের পর চীনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরোর তৃতীয় কোনো সদস্যকে পদচ্যুত করা হলো।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে দল ও সরকারের ওপর নিজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করলেন শি। মা শিংরুইয়ের এই নাটকীয় পতন বেইজিংয়ের রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই খবরটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চীনের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চীনের দুর্নীতি দমন সংস্থা সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন’ (সিসিডিআই) মা শিংরুইয়ের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি এবং পদের প্রভাব খাটিয়ে পরিবারের সদস্যদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যৌন লালসা চরিতার্থ করতে রাজনৈতিক সুবিধা কেনাবেচার’ গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে। গত এপ্রিল মাসেই আইন ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল। বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকে ৬৭ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী নেতাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই বহিষ্কারাদেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিই পলিটব্যুরোর কোনো বেসামরিক সদস্যের প্রথম পতন। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে ঝাং ইউক্সিয়া এবং গত বছরের অক্টোবরে হে ওয়েইডং নামের যে দুই পলিটব্যুরো সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাঁরা দুজনেই ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এবং চীনা রাজনীতি বিষয়ের ইতিহাসবিদ জোসেফ টরিজিয়ান এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেন, ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর মাওয়ের স্ত্রীসহ চার শীর্ষ নেতার (গ্যাং অব ফোর) গ্রেপ্তারের পর চীনের শীর্ষ নেতৃত্বে এত বড় বেসামরিক শুদ্ধি অভিযান আর দেখা যায়নি। শি জিনপিং এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিতে চান যে—তিনি যত বড় পলিটব্যুরো সদস্যই হন না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের ফেলো ক্রিস্টোফার নাই মনে করেন, আগে যেখানে কেবল শি জিনপিংয়ের প্রকাশ্য বিরোধিতা বা আনুগত্যের অভাব দেখলেই কাউকে সরানো হতো, এখন কেবল দুর্নীতির অভিযোগই পলিটব্যুরো পর্যায়ের নেতাদের সরানোর জন্য যথেষ্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২ সালে সিসিপির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর (যে বছর শি জিনপিং চীনের শীর্ষ ক্ষমতায় আসেন) মা শিংরুই নিজের আচরণ সংযত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১২ সালের পর যেকোনো ধরনের অনিয়মকে এখন শি জিনপিং তাঁর নিজের রেডলাইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।

মা শিংরুই একসময় চীনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হতেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোক্র্যাট। চীনের চাঁদে পাঠানো চন্দ্রযান এবং মানববাহী মহাকাশ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন মহাকাশ শিল্পের তরুণ মার্শাল’ খেতাব। ২০১৩ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার বছরই মা শিংরুইয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দ্রুত উত্থান ঘটে। তাঁকে গুয়াংডং প্রদেশের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২১ সালে উইঘুর মুসলিমদের দমনপীড়নের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত জিনজিয়াং প্রদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সেক্রেটারি হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে অবস্থানকালে বেইজিংয়ের কঠোর নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী নীতি অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করে তিনি শি জিনপিংয়ের পরম আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই আস্থা ও মহাকাশ জয়ের গৌরব কোনো কিছুই তাকে রক্ষা করতে পারল না।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মা শিংরুইয়ের পতনের মধ্য দিয়ে এই শুদ্ধি অভিযান শেষ হচ্ছে না। ইতিমধ্যে তার অধীনে কাজ করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নজরদারিতে এসেছেন। গত বছর প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ঝাং জিয়ানহুয়া এবং চলতি বছরের মার্চ মাসে শেনঝেনে তাঁর অধীনে কাজ করা গুও ইয়ংহাংকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

হংকং ও তাইওয়ানের একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, মা শিংরুইয়ের মতো একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় প্রযুক্তিবিদকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে শি জিনপিংয়ের একটি প্রচ্ছন্ন ভয়ও কাজ করতে পারে। ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশ গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং পরে রাজনীতিতে দ্রুত সাফল্য পাওয়া মা-কে ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হচ্ছিল। ২০২৪ সালে অত্যন্ত জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জেনারেল ভ্যালেরি জালুঝনিকে সরিয়ে দেওয়ার পর এবার পলিটব্যুরোর বেসামরিক নেতৃত্বের ওপর চড়াও হওয়া চীনের রাজনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশের খবর/এম.আর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন