# ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা
# ইরানের কেশম দ্বীপে ৬ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত
# যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি খামেনির
চলতি জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও অন্তত ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত স্থগিত রয়েছে বলেও জানিয়েছে তেহরান। দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই এ দাবি সামনে এসেছে। এদিকে, ইরানের কেশম দ্বীপের উপকণ্ঠে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার দিনগত রাত ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে দ্বীপটির আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দেশটির আধা–সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত ও ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একইসঙ্গে ইরানের একজন আলোচক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে তাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) কার্যকরভাবে ‘স্থগিত’ হয়ে গেছে।
গতকাল শনিবার ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জুলাইয়ের ৬ তারিখ থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় হতাহতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা সপ্তম রাতের মতো বিমান হামলা চালায়।
ইরান জানিয়েছে, তাদের একটি সমুদ্রের পানি থেকে লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্টে (ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট) হামলার ফলে ১০ হাজার মানুষ পানি সুবিধার বাইরে চলে গেছে। এর জবাবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়েছে।
ইসলামাবাদে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ এমওইউর সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে ও তা স্থগিত করেছে। ইরানের আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আরও বলেন, তেহরানও ‘একইভাবে সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে’ এবং এখন দেশটি আত্মরক্ষায় ব্যস্ত রয়েছে। গারিবাবাদি চলতি মাসের শুরুর দিকে চুক্তিটির প্রযুক্তিগত আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও মার্কিন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, ওয়াশিংটন গত এক সপ্তাহে চুক্তির প্রতিটি দিক লঙ্ঘন করেছে। ফারস-এর তথ্য অনুযায়ী ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায়নি এবং এই ‘আরোপিত’ যুদ্ধে কেবল নিজেদের আত্মরক্ষা করেছে।
গত শনিবার দিনের শেষভাগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলার জন্য তাদের ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেবে।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ ওয়াশিংটনের সমালোচনা করে বলেন, সমঝোতা স্মারকের কালি শুকানোর আগেই তারা হামলা শুরু করেছে। ফারস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আরেফ আরও বলেন, এই চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তেহরানের ওপর থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে।
উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে, বিশেষ করে চুক্তির ৫ নম্বর ধারায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি।
বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু: গত শনিবার এসব মন্তব্যের সময় যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। হরমুজ প্রণালী নিয়ে লড়াই তীব্র হওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং বিস্তৃত হামলার কারণে পানির প্ল্যান্টসহ সাধারণ মানুষের জীবন ও পরিষেবা হুমকির মুখে পড়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি গত শনিবার জানায়, দক্ষিণ ইরানের জাস্কের বুনজি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে সমুদ্রের পানি পাম্প করার স্টেশন এবং একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার মার্কিন হামলায় ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে, যা ২০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলাও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ।
গতকাল শনিবার ভোরে কুয়েত তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করে এবং জানায়, ইরানের হামলায় দুটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েতের ফায়ার সার্ভিস জানায়, হামলার ফলে সৃষ্ট আগুন নেভাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী আহত হয়েছেন। বাহরাইনেও বারবার এয়ার রেইড সাইরেন শোনা গেছে এবং কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলেছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরানের ১০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী কুয়েতের আল-আহমাদি বন্দরে মার্কিন সামরিক জ্বালানি জেটি এবং বাহরাইনের শেখ ইসা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান সংযোজন সাইটে আক্রমণ করেছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আজরাকে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ইরানের ‘নজরদারি সাইট, সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে’ লক্ষ্য করে রাতে আরও এক দফা হামলা চালিয়েছে।
সমঝোতা স্মারক স্থগিত: হরমুজ প্রণালীর কাছে ট্যাংকারে ইরানি হামলার পর ১০ দিন আগে আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, জুনের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি এখন ‘শেষ’। এরপর তিনি ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ পুনর্বহাল করেন এবং ইরানি তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞার ছাড়পত্র বাতিল করেন।
ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব শক্তি রপ্তানির জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে জাহাজ চলাচলের রুট নির্ধারণের অধিকার তাদের রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, প্রণালীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে, তবে মার্কিন নৌবাহিনী পুনরায় ইরানি জাহাজগুলোকে অবরুদ্ধ করছে।
ট্রাম্প নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেল ও গ্যাসের দাম কমানোর জন্য তাড়াহুড়ো করছেন। কিন্তু ইরানের ওপর তার বারবার হুমকি এবং হামলা তেহরানকে তার শর্তে আত্মসমর্পণ করতে বা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন হামলার পরিধি ও তীব্রতা বেড়েছে। তেহরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামোগুলোতে হামলা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলে সেতু ও রেললাইন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কুয়েতে হামলার মতোই তারা উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে তার জবাব দেবে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

