Logo

আন্তর্জাতিক

পারস্য উপসাগরের বাইরেও ছড়াচ্ছে ইরান যুদ্ধ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ২১:৩২

পারস্য উপসাগরের বাইরেও ছড়াচ্ছে ইরান যুদ্ধ

# প্রস্থানের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

# মার্কিন হামলা বন্ধ থাকলে আমরাও শান্ত থাকব: ইরান

যুক্তরাষ্ট্র আপাতত ইরানে হামলা স্থগিত রাখলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

টানা ১৩ রাত হামলার পর গত শনিবার ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ বহাল থাকলেও হামলা বন্ধের কারণ জানানো হয়নি। একই দিন ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি বা স্থাপনায় কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে কী পরিণতি হতে পারে, তা ইরানকে দেখানো হয়েছে।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত, উপসাগরীয় মিত্রদের উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আপাতত হামলা না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে হোয়াইট হাউস। সিএনএনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হলে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।

অন্যদিকে গতকাল শনিবার ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুর স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। রয়টার্স যাচাই করা ভিডিওতে জিজানের একটি শোধনাগারের দিক থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আরামকো। সৌদি বাহিনী জানিয়েছে, ইয়ানবুর দিকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

ইয়েমেনে আবারও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশটির সৌদি–সমর্থিত সরকার হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং উভয় পক্ষই সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। গোষ্ঠীটির নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই এখন তাদের হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

এদিকে কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। এতে একজন নাবিক নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটি। এ ঘটনায় ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে তেহরান। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত স্যাটেলাইট তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে।

প্রস্থানের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী করবেন, তা আগে থেকে অনুমান করা যায় না; আর এই স্বভাব নিয়ে তিনি প্রায়ই গর্ব করেন। তার ভাষায়, এ বিষয়টি শত্রু-মিত্র সবাইকে একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। ট্রাম্প ১৩ মাস আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার সিদ্ধান্ত। গত জানুয়ারির শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনতে কমান্ডো পাঠান।

তার ভাষ্য, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তিনি কতটা বেপরোয়া হতে পারেন। তার পূর্বসূরিরা কেউ এমন কাজ করার সাহসও করতেন না। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তিনি কেবল নিজের ‘নিজের বিবেকর কাছে’ দায়বদ্ধ। কিন্তু ইদানিং তাকে ফাঁদে আটকে পড়া এক নেতার মত মনে হচ্ছে, যিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, ধীরে ধীরে সেই যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্সিকে গ্রাস করছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত বন্ধ করা এবং দেশটির সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। তখন তিনি সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে তার ক্ষমতারও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, পাঁচ মাস পর, সেই লক্ষ্যগুলো ট্রাম্পের অধরাই রয়ে গেছে। একসময় তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, বিপুল শক্তি প্রয়োগ করে ইরানে তিনি ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। মানে সেখানকার সরকার পাল্টে মার্কিনপন্থি সরকার বসাতে পারবেন। কিন্তু এখন তিনি আবার বড় যুদ্ধ শুরু করতে ইতস্তত করছেন; কারণ তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, তেহরানে ওই কৌশল কাজ করবে না।

তেলের দাম চড়ছে, শেয়ারবাজার পড়ছে- এগুলো তিনি থামাতে পারছেন না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে; মাঝে কিছুদিন চালু ছিল, এখন আবার কমে গেছে।

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে আরেকটি সংকীর্ণ পথও এখন হুমকির মুখে। ট্রাম্প যদিও হুমকি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করবেন অথবা তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডার দখল করে নেবেন, তবে প্রকাশ্যে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে সেখানে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তার সহযোগীদের মতে, এই ব্যর্থতাগুলো ট্রাম্পকে ক্রমশ হতাশ করে তুলেছে; তার স্বভাবসুলভ আচরণকে আরও খামখেয়ালি করে তুলছে।

বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গত সপ্তাহেই সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্পের জ্বালানিমন্ত্রী। কিন্তু ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নিজে সেই চুক্তি উল্টে দেন। ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব যতক্ষণ না ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে আসছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ওই চুক্তি অকার্যকর থাকবে।

১৮ মাসের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা ওই চুক্তি এভাবে ভেস্তে যেতে দেখে সৌদিরা একেবারে হতবাক হয়ে যায়।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, যে ইরানি নেতারা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তারা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন বলে ধারণা করা হয়। যেসব জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আইআরজিসি সেসব জাহাজের ওপর গুলি চালায়।

ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরানি নেতারা চান—বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের তহবিল অবমুক্ত করা হোক এবং তেল রপ্তানি আবার চালু হোক। কিন্তু আইআরজিসি মনে হয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দেখাতেই বেশি আগ্রহী।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ আছে—আরও সামরিক হামলা চালানো, আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, অথবা বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসা।

মার্কিন হামলা বন্ধ থাকলে আমরাও শান্ত থাকব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতদিন ইরানে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখবে, ততদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা করা থেকে বিরত থাকবে ইরানও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানে ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

গত শনিবার এবং রোববার রাতে ইরানের কোনো সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালায়নি মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকোম। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মার্কিন ঘাঁটিকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেনি ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীও। তবে এর আগে টানা ১৩ দিন প্রত্যেক রাতে পরস্পরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দেওয়া সেই ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান ‘হামলার বদলে হামলা’ নীতি অনুসরণ করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা বন্ধ করে, ইরানও পাল্টা সামরিক অভিযান মুলতবি রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইতোমধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বার্তাও দেওয়া হয়েছে।’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। তবে যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে পরমাণু কর্মসূচির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে তেহরান। এতে জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, কারণ যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের এক পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

ইরানের শর্ত— যেহেতু হরমুজ প্রনালী ইরানে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে গিয়েছে, তাই এখন থেকে অন্য কোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য এই প্রণালি ব্যবহার করলে তেহরানকে টোল দিতে হবে।

তবে ইরানের এই শর্তের তীব্র বিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও। এই বিরোধিতার মধ্যেই দু’সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী ২টি ট্যাংকার জাহাজে ড্রোন হামলা করে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ওই ঘটনার জের ধরেই টানা ১৩ দিনের হামলা- পাল্টা হামলা চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন