মানবপাচারকারীদের দুষছেন প্রধানমন্ত্রী
স্পেনের সেউতায় অনুপ্রবেশকারীদের ঢল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৮
মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন সেউতায় প্রবেশের ঘটনায় মানবপাচারকারী চক্রকে দায়ী করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নজিরবিহীন এ ঢলে ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পেদ্রো সানচেজ এ ঘটনাকে ‘স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্পেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত চলাচলের ‘শেনজেন ব্যবস্থা' সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইতালি।
বিবিসি লিখেছে, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সম্প্রতি দেওয়া এক আদেশের পর এ অনুপ্রবেশের ঢল শুরু হয়। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সেউতা বা স্পেনের আরেক ছিটমহল মেলিলিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীদের তড়িঘড়ি করে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৩১ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিরে যাওয়া এক ব্যক্তি বলেন, এখানে পরিস্থিতি একদমই ভালো নয়, আনন্দদায়কও নয়। মানুষ মারা যাচ্ছে। আমি মিনতি করে বলছি— যারা এখনো আসেননি, দয়া করে আসবেন না।
উত্তর আফ্রিকা উপকূলের সেউতা— জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে একে ব্যবহার করছে। গ্রীষ্মে সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে সেউতায় প্রবেশের বড় ধরনের চেষ্টা চালানো হয়ে থাকে।
মরক্কো দীর্ঘদিন ধরে সেউতা ও মেলিলিয়াকে নিজেদের বলে দাবি জানিয়ে আসছে। এ ছিটমহল দুটিই আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত, যা প্রায়ই দুদেশের কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সেউতায় সম্প্রতি অভিবাসনপ্রার্থীদের চাপ বেড়ে যাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন মাদ্রিদের কাছে সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস জানান, নতুন আগমনকারীদের সংখ্যা তাদের শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। শহরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০ জন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের হিসাব অনুযায়ী বৃহস্পতিবার থেকে সেউতায় প্রবেশকারীদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতা ও পাশের মেলিলিয়ায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করেছে স্পেন সরকার। সেখানে রাতারাতি ৩০০ থেকে ৪০০ জনের মতো অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার সেউতা সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপব্যাখ্যা দিয়ে পাচারকারী চক্রগুলো সোশাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়েছিল, যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই সীমান্ত এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি সীমান্ত সুরক্ষায় বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন, পাশাপাশি মরক্কোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর আশ্বাস দেন।
বিবিসি লিখেছে, অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগ তরুণ হলেও অনেক নারী, শিশু, এমনকি কোলের শিশুও রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে অন্তত সাত হাজার জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু।
সাধারণত অভিবাসীরা কয়েক কিলোমিটার সাঁতার কেটে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু এবার তাদের খুব সহজেই সীমান্তের মূল বেড়ার কাছাকাছি চলে আসতে দেখা গেছে। সীমান্ত সুরক্ষায় থাকা মরক্কোর প্রহারীরা কেন তাদের বাধা দেয়নি বা ছত্রভঙ্গ করেনি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাবা-মাকে দেখতে সেউতায় আসা কারমেন গঞ্জালেজ বারমুডেজ বিবিসিকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত ভয়ানক ছিল। সাঁতারের পোশাক পরা হাজার হাজার মানুষ ভেজা শরীরে সমুদ্র থেকে উঠে আসছে। আমি জানি তাদের অধিকাংশই হয়তো উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এসেছে, কিন্তু সবাইকে তো আমরা সেই সুবিধা দিতে পারি না।
তিনি বলেন করেন, ২০২১ সালে যখন অভিবাসীদের একই ধরনের ঢল নেমেছিল, তখন আমাদের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখেছি। কিন্তু এখন তারা রাস্তায় থেকেও নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল, যা সত্যিই ভীতিকর।”
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ভিক্টর ওরটিজ সোতোমেয়র বলেন, পুরো শহর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দিয়ে ভরা ছিল। বিশেষ করে খাবারের খোঁজে তারা প্রতি মোড়ে ও স্কয়ারে অবস্থান নিচ্ছিল। পরিস্থিতির অবনতি দেখে পুলিশ দোকানপাট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়। ভয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
মরক্কোতে উচ্চ বেকারত্বে ভুগতে থাকা জেন-জিরা গত বছর জীবনযাত্রার মান ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছিল।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত দুই হাজার ৮২৬ জন সেউতায় এবং ১৮১ জন মেলিলিয়ায় প্রবেশ করেছিল। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ সংখ্যা আগেই অনেক বেশি। এর আগে পুরো ২০২৫ সালে ৯৯৪ জন, ২০২৪ সালে ৪৭৬ জন এবং ২০২৩ সালে ৪৬৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেছিল।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

