কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৪০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৭
ছবি: সংগৃহীত
কলম্বিয়ায় সাত দশমিক চার মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো প্রায় তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে মঙ্গলবারও (১১ আগস্ট) নিরলস অভিযান চালিয়ে যান উদ্ধারকর্মীরা। তাদের ভাষায়, ‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।’
সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে পশ্চিম কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। দেশটির চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কালি ও পেরেইরা শহর। বহু ভবন ধসে পড়েছে, হাজারো বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ও জরুরি সেবা ব্যাহত হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি কালি। সেখানে মঙ্গলবার ভোরে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করেন দমকলকর্মীরা। ভূমিকম্পের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশ করে বলা হয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে- ‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।’
ভূমিকম্পের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। গত শুক্রবারই তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সোমবার রাতে তিনি কালিতে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশপাশের ভালে দেল কাওকা বিভাগে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৮৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্ত শহর পেরেইরা থেকে পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য দেন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, নিহতদের পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার ৬০০ মানুষ আহত হয়েছেন এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে এক হাজার ১০০-এর বেশি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও আট হাজারের বেশি বাড়ি।
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পেরেইরা ও কালিসহ বিভিন্ন শহরে অনেক মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। কারও বাড়ি ধসে পড়েছে, আবার কেউ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় ঘরে ফেরেননি।
পেরেইরা শহরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। কালির প্রায় ১৩০ মাইল উত্তরে অবস্থিত শহরটিতে ৫৮টি ভবন ধসে পড়েছে। এসব ভবনের কয়েকটিতে অন্তত ৫৩ জন আটকা পড়ে আছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। সেখানে অন্তত ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। শহরটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
কালিতে ধ্বংসস্তূপে শত শত মানুষ: দুই কোটি ২০ লাখ মানুষের শহর কালিতে এখন পর্যন্ত ৯৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধার তৎপরতা সমন্বয়ের জন্য সেখানে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে।
কালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের মঙ্গলবার জানান, শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় ২৩৯ জন এখনও আটকা পড়ে আছেন। আহত হয়েছেন ৯৪৯ জন। শহরে ৪৫টি ভবন পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।
শহরের একটি হাসপাতালের ওপরের কয়েকটি তলাও ধসে পড়েছে। এর কয়েকটি অংশে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হত। ধসের পর সেখানে কয়েকজন রোগী আটকা পড়েন।
কালির উত্তরের কালিমা এলাকায় জিমনাসিও কালিমা স্কুলের একটি অংশ ধসে চার শিশু মারা গেছে। স্থানীয় মেয়র আন্তোনিও কাদাভিদ জানিয়েছেন, আরও কয়েকজন শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। মোট ৩০ শিশুকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের এই পরিস্থিতির মধ্যে লুটপাট ঠেকাতে ওই এলাকায় রাতের বেলা কারফিউ জারি করেছেন মেয়র।
মঙ্গলবারও কালিতে কয়েক দফা কম্পন অনুভূত হয়। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে ৭০টির বেশি পরাঘাত হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে তিন দশমিক ছয় মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর একটি ছিল সান হোসে দেল পালমারে এবং অন্যটি সান্তান্দেরে।
পেরেইরায় উদ্ধার তৎপরতা: ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে পেরেইরায় শহরে ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সোশাল মিডিয়ায় আসা ভিডিওতে সেখানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে শত শত স্বেচ্ছাসেবীকে কাজ করতে দেখা গেছে।
পেরেইরার বিমানবন্দরের কাছে পারকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, শহরের পরিস্থিতি ভয়াবহ।
তিনি বলেন, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শহরের প্রধান চত্বর বলিভার স্কয়ারে অন্তত একটি ভবন ধসে পড়েছে। আরও কয়েকটি স্থাপনার নিচে বাস ও ট্রাক আটকে আছে। সেগুলোও ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় মানুষ আতঙ্কে রয়েছে।
মানিজালেসেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি: মানিজালেস শহরের মেয়র হোর্হে এদুয়ার্দো রোহাস জানিয়েছেন, সেখানে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরের ৬০টি ভবন আংশিক বা পুরোপুরি ধসে পড়েছে।
পরবর্তী পরাঘাতের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বাসিন্দাদের অজানা উৎস থেকে আসা চেইন মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ছড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ধরনের বার্তায় মিথ্যা বা যাচাই না করা তথ্য থাকতে পারে, যা মানুষের মধ্যে আরও উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব: ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহায়তার প্রস্তাব পাচ্ছে কলম্বিয়া।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে কলম্বিয়ার জনগণ ও সরকারের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এবং দেশটির উদ্ধার ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমে সহায়তার কথা জানিয়েছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস বলেছেন, কলম্বিয়ায় থাকা ১৬৪ জন স্প্যানিশ নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত স্পেনের কোনো নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কলম্বিয়াকে এক কোটি ৫৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া একুয়েডর, ব্রাজিল, এল সালভাদর ও ভেনেজুয়েলাও কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
১৯৯৯ সালের পর এটিই কলম্বিয়ায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। ওই বছরের জানুয়ারিতে দেশটির একই পশ্চিমাঞ্চলের কফি উৎপাদনকারী এলাকায় ছয় দশমিক দুই মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

